ক্ষেতে সবজির বাম্পার ফলন হলেও কৃষকের মুখে হাসি নেই। উৎপাদক থেকে ভোক্তা—বাজারের এক অদ্ভুত বৈপরীত্য।বাজারে সবজির কাঙ্ক্ষিত দাম না থাকায় চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন লালমনিরহাট জেলার আদিতমারী উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চলের প্রান্তিক কৃষকেরা। পরিবহন খরচ, সার, বীজ ও ওষুধের চড়া দামের কারণে উৎপাদন খরচ উঠানোই এখন তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জেলার মধ্যে কমলাবাড়ী, ভাদাই,সারপুকুর,ভেলাবাড়ী ও পলাশীসহ বিভিন্ন এলাকায় কৃষকরা সবজি চাষ করে থাকেন। তারমধ্যে সবচেয়ে বেশি সবজি চাষ করে খ্যাতি অর্জন করেছেন কমলাবাড়ী ইউনিয়নের কৃষকরা। এই এলাকার উৎপাদিত সবজি দেশের বিভিন্ন স্থানে যায়। তারা বারোমাসি বিভিন্ন সবজি চাষ করে থাকে।
চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং কৃষকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে শিম, ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন, পটল ও লাউয়ের মতো শীতকালীন ও বারোমাসি সবজির ব্যাপক ফলন হয়েছে। কিন্তু কৃষকদের মুখে উৎসবের কোনো আনন্দ নেই। কারণ, পাইকারি বাজারে উৎপাদিত পণ্যের যে দাম মিলছে, তাতে পরিবহন খরচ ও শ্রমের মজুরিই উঠছে না। সাধারণ মানুষের স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার কথা থাকলেও, বর্তমানে চিত্রটি সম্পূর্ণ উল্টো। একদিকে যখন খুচরা বাজারে কিছু সবজির দাম কমতির দিকে, অন্যদিকে তখন কৃষকদের মাথায় হাত। মাঠে বাম্পার ফলন হওয়া সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছেন না উৎপাদনকারীরা। ‘সবজির দাম নাই’—এই হাহাকার এখন এই অঞ্চলের বিভিন্ন সবজি উৎপাদনকারী অঞ্চলের কৃষকদের মুখে মুখে।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) উপজেলার কমলাবাড়ী ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী কুমড়ীরহাটের সবজি বাজারে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন ধরনের যানবাহন করে ফুলকপি, বাধাকপি, লাউ, শিম, ডেংগা শাক, কুমড়াসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি বাজারে নিয়ে এসেছেন। দুর-দুরান্তের পাইকার না আসায় কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। আবার সবজি কম দামেরর ফলে বসে আছেন কৃষকরা। আবার কিছু কিছু সবজি বিক্রি করতে না পেরে বাজারে ফেলে যাচ্ছেন। সবজি বাজারে গিয়ে দেখা যায়, বেগুন মন (৪০ কেজি) প্রতি ৩ থেকে ৩ শত ৫০ টাকা যা কেজি প্রতি ৮ থেকে ১০ টাকা,মুলা মন (৪০ কেজি) ৫ থেকে ৬ শত কেজি প্রতি ৭ থেকে ১০ টাকা, ফুলকপি ১০ থেকে ২০ টাকা (পিছ), বাঁধাকপি ১৫ থেকে ২০ টাকা (পিছ), লাউ ৩ থেকে ৫ টাকা (পিছ), শিম ৪০ টাকা (কেজি) বিক্রি করা হচ্ছে।
বাজারে সবজির দাম কম হওয়ায় বড় বড় ব্যবসায়ীরা লোকশানের ভয়ে সবজি কিনতে বাজারে আসছেন না। ফলে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত সবজি কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। সবজি বিক্রি করে শুধু পরিবহন ভাড়ায় দিতে হচ্ছে। শ্রমিকের মজুরী বাড়ি থেকে এনে দিতে হচ্ছে। এ অবস্থায় তাদের বিশাল লোকসানের কবলে পড়তে হচ্ছে বলে তারা জানান।
পাইকারি বাজারগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কয়েক দিনের ব্যবধানে বিভিন্ন ধরনের সবজির দাম আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। খেত থেকে যে দামে সবজি বিক্রি হচ্ছে, তা দিয়ে তোলা (হারভেস্টিং) ও বাজারে আনার পরিবহন খরচও উঠছে না বলে অভিযোগ করছেন কৃষকেরা।
কৃষকদের মতে, এ বছর জ্বালানি তেল, সার ও কীটনাশকের দাম বৃদ্ধির কারণে প্রতি বিঘা জমিতে সবজি চাষের উৎপাদন খরচ গত বছরের তুলনায় ২০-৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু বিক্রির সময় এসে তারা উপযুক্ত মূল্য পাচ্ছেন না।
কুমড়ীরহাটে সবজি বিক্রি করতে আসা বড় কমলাবাড়ী (বাদিয়ার চড়া) এলাকার জালাল,আশরাফুল ও সাহাবুদ্দিন জানান, গত বছর লাউ চাষ করে বেশ লাভবান হয়েছিলাম কিন্তু এ বছর বড় আশা নিয়ে চাষ করেছি। বাজারে লাউয়ের দাম নেই, ক্রেতাও নেই,যা বর্তমান বাজারে প্রতি লাউয়ের (পিছ) ৩ থেকে ৫ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। আবার কোন সময় বিক্রি না হলে বাজারে ফেলে যেতেও হয়। চাষ করতে গিয়ে দেখা গেছে বেশি দামে সার,বীজ,কীটনাশক কিনে চাষ করে এখন বিক্রি করে বিশাল লোকসানের কবলে পড়তে হচ্ছে। এখন মাথায় হাত দেওয়া ছাড়া আর কিছুই করা সম্ভব নয়।
বড় কমলাবাড়ী পশ্চিমপাড়া এলাকার আমিনুল ইসলাম বাবুল আক্ষেপ করে বলেন, “এক মণ বেগুন খেত থেকে তুলে বাজারে আনতে যে খরচ হয়, বিক্রি করে তার অর্ধেকও পাওয়া যাচ্ছে না। বর্তমানে বাজারে বিক্রি করে শ্রমিকেরর মজুরী ও পরিবহনের ভাড়ার টাকায় হয় না। অনেক সময় খেতেই সবজি নষ্ট করার অবস্থা তৈরি হয়েছে।” এই বছর সবজির দাম যে সস্তা আর কোনো বছর এই রকম সস্তা হয়নি। ভ্যানে বস্তা বোঝাই করে যে সবজি নিয়ে বাজারে আসি সেই সবজি আমাদের পানি ধরে বিক্রি করতে হচ্ছে শুধু। তাই সবজি করতে আমাদের যে টাকা খরচ হয়েছে সেই টাকাও এখন পর্যন্ত তুলতে পারিনি। বড় আশা নিয়ে দেড় দোন (৫১ শতক) জমিতে চড়া দামে বীজ,সার ও কিটনাশক প্রয়োগ বেগুন চাষ করেই খরচ হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার টাকার মত।
পশ্চিমপাড়া এলাকার সুরজত নামের আরেক লাউ চাষী হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “বীজ, সার, কীটনাশক আর সেচের দাম বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। ধারদেনা করে জমি আবাদ করেছি। এখন ক্ষেতের ফসল লাউ বাজারে নিয়ে দেখি ক্রেতা নেই, লাউ নিতে চায় না। পাইকাররা পানির দরে ৩ থেকে ৫ টাকা দরে কিনতে চায়। এই দামে বিক্রি করলে ঋণ শোধ তো দূরের কথা, সংসার চালানোই দায় হয়ে পড়বে।”
সবজি ক্রেতা রাজ্জাক জানান, ‘শীতরে শুরুর দিকে সকল সবজরি দাম খুব বেশি ছিল। এখন তা নেই। আগে ৫০০ টাকার সবজি কিনলেও ব্যাগ ভরত না আর এখন ১০০ টাকার সবজি বস্তা বড়ে বাসায় নিয়ে যাওয়া যায়। কিছুদিন আগে একটি লাউ কিনেছি ৪০-৪৫ টাকায়। এখন দুটি লাউ কিনলাম ৬ টাকায়। বাজারে ‘সব সবজির দাম খুব কম আমি প্রতি বেলার খাবাররে তালিকায় সবজি রাখনে বলে জানান।
কৃষকদের দাবী লোকসানের হাত থেকে বাঁচাতে সরকারি উদ্যোগে পরিবহন সুবিধা বৃদ্ধি এবং জেলা পর্যায়ে সবজি সংরক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সাথে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে সরাসরি কৃষকদের থেকে পাইকারি বাজারে পণ্য পৌঁছানোর জন্য বিশেষ ‘ফারমার্স মার্কেট’ বা কৃষক বাজারের পরিধি বাড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন তারা। অতি দ্রুত সবজি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা, পরিবহন ব্যবস্থার খরচ কমানো এবং সরকারের পক্ষ থেকে সবজির একটি সর্বনিম্ন সহায়ক মূল্য নির্ধারণ করা না হলে আগামীতে কৃষকেরা সবজি চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
রেজাউল করিম রাজ্জাক, বিশেষ প্রতিনিধি ;- 
































