লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলায় টিআর, কাবিখা ও কাবিটা কর্মসূচির আওতায় নেওয়া বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের পর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মাজহানুর রহমানকে স্ট্যান্ড রিলিজ করে ঢাকায় সংযুক্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
চলতি মাসের ২১ তারিখে কালীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ত্রাণ প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা ও প্রতিবাদ শুরু হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বিষয়টি খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রত্যন্ত এলাকার রাস্তাঘাট, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি স্থাপনার উন্নয়নের জন্য ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের আওতায় নেওয়া কয়েকটি প্রকল্প কাগজপত্রে শতভাগ বাস্তবায়িত দেখানো হলেও মাঠপর্যায়ে সেসব প্রকল্পের দৃশ্যমান অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভুয়া বিল-ভাউচার ও মাস্টাররোলের মাধ্যমে সরকারি বরাদ্দের অর্থ ও খাদ্যশস্য উত্তোলন করা হয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে কয়েকটি প্রকল্পের বরাদ্দ ও বাস্তবায়ন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
এর মধ্যে কালীগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চত্বরের ভেতরের সড়কগুলোতে সড়কবাতি স্থাপনের জন্য ৩ লাখ টাকা এবং উপজেলা পরিষদ গেট থেকে ফায়ার সার্ভিস পর্যন্ত সড়কবাতি স্থাপনের জন্য আরও ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। দুই প্রকল্পে মোট ৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও স্থানীয়দের দাবি, সেখানে নতুন কোনো খুঁটি বা সড়কবাতি স্থাপনের দৃশ্যমান প্রমাণ নেই। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের ৩০ জুনের মধ্যে এসব বরাদ্দের অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।
এ ছাড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালের মাঠে মাটি ভরাটের নামে ৫ মেট্রিক টন চাল এবং উপজেলা কৃষি অফিসের সামনে মাটি ভরাটের নামে ৫ মেট্রিক টনের বেশি খাদ্যশস্য বরাদ্দ উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্প অনুযায়ী এসব স্থানে মাটি ভরাটের কাজের দৃশ্যমান প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তুষভান্ডার বাজারে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের জন্য ৪ লাখ ৫ হাজার টাকা বরাদ্দ উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে। বাজারের ব্যবসায়ীদের দাবি, সেখানে মাত্র কয়েকটি নিম্নমানের ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। বরাদ্দের পুরো অর্থের বিপরীতে প্রকল্পের কাজ কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) এবং সংশ্লিষ্ট পিআইও কার্যালয়ের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে এসব অনিয়ম হয়ে থাকতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আগের বরাদ্দে সম্পন্ন হওয়া কাজকে নতুন প্রকল্প হিসেবে দেখিয়ে পুনরায় বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
প্রকল্পগুলোর বিষয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মাজহানুর রহমান বরাদ্দের অর্থ উত্তোলনের বিষয়টি স্বীকার করলেও উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, তিনি গত ২৫ জুন দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। প্রকল্পগুলোর বিষয়ে তিনি খোঁজখবর নিয়ে বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন বলে জানান।
পরবর্তীতে এসব অভিযোগ ও সংবাদ প্রকাশের বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসে। এর মধ্যে পিআইও মাজহানুর রহমানকে ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে স্ট্যান্ড রিলিজ করে ঢাকায় সংযুক্ত করার খবর পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে অভিযোগগুলোর তদন্তে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এ ঘটনায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগগুলো যথাসময়ে কেন গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হয়নি এবং প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণে প্রশাসনিক তদারকি কতটা ছিল- তা নিয়েও আলোচনা চলছে। তবে এ বিষয়ে ইউএনওর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট তদন্তের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে আজ রোববার ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের একজন উপ-পরিচালক কে প্রদান করে তদন্ত টিম গঠন করেছে মন্ত্রণালয়। আগামী বুধবার থেকে এই তদন্ত কমিটি তদন্ত শুরু করবেন বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, সরকারি অর্থ ও খাদ্যশস্য বরাদ্দের ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে ও পরে কার্যকর তদারকি এবং মাঠপর্যায়ে যাচাই জরুরি। অভিযোগগুলো সত্য হলে সরকারি অর্থের অপব্যবহারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
এদিকে অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশের পর স্থানীয় পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা তৈরি হলেও কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীর নীরবতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে অভিযোগের অনুসন্ধান ও তথ্য প্রকাশ অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক।
বর্তমানে মন্ত্রণালয়ের বিশেষ কমিটির তদন্তের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন স্থানীয়রা। তদন্তে প্রকল্পগুলোর কাগজপত্র, বরাদ্দ, অর্থ ও খাদ্যশস্য উত্তোলন, বাস্তবায়ন এবং মাঠপর্যায়ের কাজ যাচাই করা হলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে বলে আশা করছেন তারা।
সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ এবং সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল। একই সঙ্গে সরকারি তহবিলের অর্থ ও খাদ্যশস্য যাতে ভবিষ্যতে অনিয়মের মাধ্যমে অপব্যবহার না হয়, সে জন্য কার্যকর নজরদারিরও দাবি উঠেছে।
প্রতিবেদন: মো: ফারুক হোসেন তথ্যসুত্র: এনটিভি 



























