ঢাকা ০৮:৪০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬, ৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং

🌤️ বাংলাদেশের বিভাগসমূহের লাইভ আবহাওয়া

নবীজির (সা.) ১৭টি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা

কুরবানি মুসলিম উম্মাহর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর মহান ত্যাগের স্মারক। ঈদুল আজহা শুধু আনন্দের দিন নয়; এটি আত্মত্যাগ, আনুগত্য ও আল্লাহভীতির এক অনন্য শিক্ষা। ইসলামের প্রতিটি বিধানের মতো কুরবানির ক্ষেত্রেও রয়েছে সুস্পষ্ট নিয়ম-কানুন ও নবী করিম (সা.)-এর বাস্তব নির্দেশনা। কুরআন ও হাদিসে ঈদ এবং কুরবানির গুরুত্ব, আদব, পশু নির্বাচন, জবাই পদ্ধতি ও গোশত বণ্টন সম্পর্কে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ

‘অতএব তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামাজ আদায় কর এবং কুরবানি কর।’ (সুরা কাউসার: আয়াত ২)

অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ তাআলা বলেন—

لَنْ يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَٰكِنْ يَنَالُهُ التَّقْوَىٰ مِنْكُمْ

‘আল্লাহর কাছে পৌঁছে না কুরবানির পশুর গোশত কিংবা রক্ত; বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।’ (সুরা হজ: আয়াত ৩৭)

নিচে ঈদ ও কুরবানি সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ১৭টি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা নতুন আঙ্গিকে তুলে ধরা হলো—

১. ঈদুল আজহা মুসলিম উম্মাহর অন্যতম ঈদ

ইসলামে দুটি ঈদ— ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। জাহেলি যুগের উৎসবের পরিবর্তে আল্লাহ মুসলমানদের এ দুই ঈদ দান করেছেন। হজরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় এসে দেখলেন লোকেরা দুটি দিন উৎসব পালন করে। তিনি বললেন— ‘আল্লাহ তোমাদেরকে এ দুটি দিনের পরিবর্তে আরও উত্তম দুটি দিন দিয়েছেন— ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতর।’ (আবু দাউদ ১১৩৪; নাসাঈ ও মুসনাদে আহমাদ)

২. ঈদুল আজহা পালন আল্লাহর নির্দেশ

ঈদুল আজহা শুধু সামাজিক উৎসব নয়; এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত ইবাদত। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন— ‘আমাকে ইয়াওমুল আজহার আদেশ দেওয়া হয়েছে; আল্লাহ এ দিনকে এ উম্মতের জন্য ঈদ বানিয়েছেন।’ (মুসনাদে আহমাদ; ইবনে হিব্বান; আবু দাউদ; নাসাঈ)

৩. ঈদের নামাজের পর খাবার গ্রহণ

রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদুল আজহার দিন নামাজ আদায়ের আগে কিছু খেতেন না। ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদুল ফিতরের দিন কিছু না খেয়ে বের হতেন না এবং ঈদুল আজহার দিন নামাজের আগে কিছু খেতেন না।’ (তিরমিজি ৫৪২)

এর মাধ্যমে কুরবানির গোশত দিয়ে দিনের প্রথম আহার করার আমল প্রকাশ পায়।

৪. ঈদগাহে হেঁটে যাওয়া

নবীজি (সা.) ঈদগাহে পায়ে হেঁটে যেতেন এবং ফিরে আসতেন। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন— ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যেতেন এবং পায়ে হেঁটে ফিরতেন।’ (ইবনে মাজাহ ১২৯৫)

৫. যাওয়া ও আসার পথে ভিন্ন রাস্তা ব্যবহার

ঈদের দিনে রাসুল (সা.) এক পথে যেতেন, অন্য পথে ফিরতেন। হজরত জাবির (রা.) বলেন— ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদের দিন এক পথ দিয়ে যেতেন এবং অন্য পথ দিয়ে ফিরতেন।’ (বুখারি ৯৮৬)

৬. ঈদের শুভেচ্ছা ও দোয়া

সাহাবায়ে কেরাম ঈদের দিনে একে অপরকে দোয়া দিতেন—

تَقَبَّلَ اللَّهُ مِنَّا وَمِنْكَ

উচ্চারণ: ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা’

অর্থ: ‘আল্লাহ আমাদের ও আপনার আমল কবুল করুন।’ (ফাতহুল বারি)

৭. ঈদের নামাজ সকাল সকাল আদায়

রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদের নামাজ দ্রুত আদায় করতেন, বিশেষত কুরবানির ঈদে। হজরত বারা ইবনে আজিব (রা.) বলেন—

‘আমাদের এ দিনের প্রথম কাজ হলো নামাজ আদায় করা, এরপর কুরবানি করা।’ (বুখারি ৯৬৮; মুসলিম)

আরও পড়ুন
কুরবানির নির্ধারিত সময় কতদিন? জেনে নিন শরিয়তের গুরুত্বপূর্ণ বিধান
কুরবানির নির্ধারিত সময় কতদিন? জেনে নিন শরিয়তের গুরুত্বপূর্ণ বিধান

৮. প্রতি বছর কুরবানি করা

নবীজি (সা.) জীবনের প্রতিটি বছর কুরবানি করেছেন। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন— ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় অবস্থানকালে প্রতি বছর কুরবানি করেছেন।’ (তিরমিজি ১৫০৭)

৯. কুরবানির পশু ও দোয়া

রাসুলুল্লাহ (সা.) সুন্দর, সুস্থ ও শিংওয়ালা দুম্বা কুরবানি করতেন। জবাইয়ের সময় তিনি পড়তেন—

إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ…

‘আমি একনিষ্ঠভাবে আমার মুখমণ্ডল সেই সত্তার দিকে ফিরালাম যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন…’ (আবু দাউদ ২৭৯৫)

১০. পশু জবেহ ও নহরের পদ্ধতি

ছাগল, ভেড়া ও গরু জবেহ করতে হয়; আর উট নহর করতে হয়। হজরত আনাস (রা.) বলেন— ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলে নিজ হাতে দুম্বা জবেহ করেছেন।’ (বুখারি ৫৫৬৫; মুসলিম)

১১. পরিবারের পক্ষ থেকেও কুরবানি

রাসুলুল্লাহ (সা.) তার স্ত্রীদের পক্ষ থেকেও কুরবানি করেছেন। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন— ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর স্ত্রীদের পক্ষ থেকে গরু কুরবানি করেছেন।’ (বুখারি, মুসলিম)

১২. কুরবানির পশুর নির্ধারিত বয়স

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— ‘তোমরা মুসিন্নাহ (নির্ধারিত বয়সের পশু) ছাড়া জবেহ করবে না।’ (মুসলিম ১৯৬৩)

পশুর বয়স হতে হবে—

> উট: কমপক্ষে ৫ বছর

> গরু/মহিষ: কমপক্ষে ২ বছর

> ছাগল: কমপক্ষে ১ বছর

> ভেড়া/দুম্বা: ৬ মাস হলেও চলবে

১৩. ত্রুটিযুক্ত পশু কুরবানি করা নিষিদ্ধ

অন্ধ, অসুস্থ, খোঁড়া বা অতিরিক্ত দুর্বল পশু কুরবানি করা যাবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— ‘চার ধরনের পশু কুরবানির উপযুক্ত নয়— স্পষ্ট কানা, স্পষ্ট রোগাক্রান্ত, স্পষ্ট খোঁড়া ও অত্যন্ত দুর্বল পশু।’ (আবু দাউদ ২৮০২, নাসাঈ)

আল্লাহ তাআলা বলেন—

لَنْ تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّىٰ تُنفِقُوا مِمَّا تُحِبُّونَ

‘তোমরা কখনো পূর্ণ নেকি লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা প্রিয় বস্তু আল্লাহর পথে ব্যয় করো।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ৯২)

১৪. গরু ও উটে সাতজন শরিক হওয়া

একটি গরু বা উটে সাতজন পর্যন্ত শরিক হতে পারে। হজরত জাবির (রা.) বলেন— ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন, একটি উট ও একটি গরুতে সাতজন করে শরিক হতে।’ (মুসলিম ১৩১৮)

১৫. পশুকে কষ্ট না দিয়ে জবেহ করা

ইসলাম প্রাণীর প্রতিও দয়া ও উত্তম আচরণের শিক্ষা দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন— ‘তোমরা যখন জবেহ করবে, উত্তম পদ্ধতিতে জবেহ করবে। ছুরিতে শান দেবে এবং পশুকে শান্তি দেবে।’ (মুসলিম ১৯৫৫)

১৬. কুরবানির গোশত সংরক্ষণ ও বণ্টন

কুরবানির গোশত খাওয়া, সংরক্ষণ ও সাদকা করা বৈধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— ‘খাও, সংরক্ষণ কর এবং সাদকা কর।’ (মুসলিম ১৯৭১)

তবে কুরবানির পশুর গোশত বা চামড়া বিক্রি করে কসাইয়ের পারিশ্রমিক দেওয়া যাবে না। (মুসলিম, বুখারি)

১৭. সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানি না করার সতর্কতা

কুরবানি সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আমল। হাদিসে পাকে এসেছে—

مَنْ كَانَ لَهُ سَعَةٌ وَلَمْ يُضَحِّ فَلَا يَقْرَبَنَّ مُصَلَّانَا

‘যার সামর্থ্য আছে অথচ কুরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছে না আসে।’ (ইবনে মাজাহ ৩১২৩)

কুরবানি শুধু পশু জবেহ করার নাম নয়; এটি আত্মত্যাগ, আনুগত্য, তাকওয়া ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক মহান ইবাদত। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো নিয়ম অনুযায়ী কুরবানি আদায় করলে এ ইবাদত পরিপূর্ণতা লাভ করে। তাই কুরবানির বাহ্যিক আয়োজনের পাশাপাশি অন্তরে তাকওয়া, আন্তরিকতা ও আল্লাহভীতি ধারণ করাই একজন মুমিনের প্রকৃত দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সুন্নাহ অনুযায়ী বিশুদ্ধভাবে কুরবানি আদায়ের তৌফিক দান করুন। আমিন।

নিউজ বিজয় ২৪ডট কম/এফএইচএন
আপলোডকারির তথ্য

NewsBijoy24. Com

📰 নিউজবিজয়২৪.কম এমন একটি অনলাইন সংবাদপত্র, যার প্রতিটি শব্দে জড়িয়ে আছে সত্যের অঙ্গীকার ও মানবিকতার দায়বদ্ধতা। এই পত্রিকাটি উৎসর্গ করা হলো আমার পরম শ্রদ্ধেয় মা ও বাবার পবিত্র স্মৃতির উদ্দেশ্যে-যারা আজ এই পৃথিবীতে নেই, কিন্তু তাদের শিক্ষা, আদর্শ ও দোয়ার আলো আজও আমাদের পথ দেখায়। তাদের নিঃস্বার্থ ত্যাগ ও ভালোবাসার প্রেরণায় প্রতিষ্ঠিত এই সংবাদমাধ্যমের লক্ষ্য সত্য প্রকাশ, অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং মানুষের পাশে নির্ভীকভাবে দাঁড়ানো। হে আল্লাহ, আমার মা-বাবাকে জান্নাতুল ফেরদৌসে উচ্চ মাকাম দান করুন। আমিন। NewsBijoy24.Com 📰 সত্যের পথে, বিশ্বাসের সাথে।
জনপ্রিয় সংবাদ
⚽ বিশ্বকাপ ফুটবল লাইভ স্কোর ২০২৬

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিক্ষাবান্ধব সরকার- বাবুল

নবীজির (সা.) ১৭টি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা

আপডেট সময় ০৬:৫৩:৫৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬

কুরবানি মুসলিম উম্মাহর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর মহান ত্যাগের স্মারক। ঈদুল আজহা শুধু আনন্দের দিন নয়; এটি আত্মত্যাগ, আনুগত্য ও আল্লাহভীতির এক অনন্য শিক্ষা। ইসলামের প্রতিটি বিধানের মতো কুরবানির ক্ষেত্রেও রয়েছে সুস্পষ্ট নিয়ম-কানুন ও নবী করিম (সা.)-এর বাস্তব নির্দেশনা। কুরআন ও হাদিসে ঈদ এবং কুরবানির গুরুত্ব, আদব, পশু নির্বাচন, জবাই পদ্ধতি ও গোশত বণ্টন সম্পর্কে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

🔔 নিউজ বিজয়ের সর্বশেষ খবর পেতে টেলিগ্রাম চ্যানেল জয়েন করুন

فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ

‘অতএব তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামাজ আদায় কর এবং কুরবানি কর।’ (সুরা কাউসার: আয়াত ২)

অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ তাআলা বলেন—

لَنْ يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَٰكِنْ يَنَالُهُ التَّقْوَىٰ مِنْكُمْ

‘আল্লাহর কাছে পৌঁছে না কুরবানির পশুর গোশত কিংবা রক্ত; বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।’ (সুরা হজ: আয়াত ৩৭)

নিচে ঈদ ও কুরবানি সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ১৭টি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা নতুন আঙ্গিকে তুলে ধরা হলো—

১. ঈদুল আজহা মুসলিম উম্মাহর অন্যতম ঈদ

ইসলামে দুটি ঈদ— ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। জাহেলি যুগের উৎসবের পরিবর্তে আল্লাহ মুসলমানদের এ দুই ঈদ দান করেছেন। হজরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় এসে দেখলেন লোকেরা দুটি দিন উৎসব পালন করে। তিনি বললেন— ‘আল্লাহ তোমাদেরকে এ দুটি দিনের পরিবর্তে আরও উত্তম দুটি দিন দিয়েছেন— ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতর।’ (আবু দাউদ ১১৩৪; নাসাঈ ও মুসনাদে আহমাদ)

২. ঈদুল আজহা পালন আল্লাহর নির্দেশ

ঈদুল আজহা শুধু সামাজিক উৎসব নয়; এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত ইবাদত। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন— ‘আমাকে ইয়াওমুল আজহার আদেশ দেওয়া হয়েছে; আল্লাহ এ দিনকে এ উম্মতের জন্য ঈদ বানিয়েছেন।’ (মুসনাদে আহমাদ; ইবনে হিব্বান; আবু দাউদ; নাসাঈ)

৩. ঈদের নামাজের পর খাবার গ্রহণ

রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদুল আজহার দিন নামাজ আদায়ের আগে কিছু খেতেন না। ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদুল ফিতরের দিন কিছু না খেয়ে বের হতেন না এবং ঈদুল আজহার দিন নামাজের আগে কিছু খেতেন না।’ (তিরমিজি ৫৪২)

এর মাধ্যমে কুরবানির গোশত দিয়ে দিনের প্রথম আহার করার আমল প্রকাশ পায়।

৪. ঈদগাহে হেঁটে যাওয়া

নবীজি (সা.) ঈদগাহে পায়ে হেঁটে যেতেন এবং ফিরে আসতেন। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন— ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যেতেন এবং পায়ে হেঁটে ফিরতেন।’ (ইবনে মাজাহ ১২৯৫)

৫. যাওয়া ও আসার পথে ভিন্ন রাস্তা ব্যবহার

ঈদের দিনে রাসুল (সা.) এক পথে যেতেন, অন্য পথে ফিরতেন। হজরত জাবির (রা.) বলেন— ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদের দিন এক পথ দিয়ে যেতেন এবং অন্য পথ দিয়ে ফিরতেন।’ (বুখারি ৯৮৬)

৬. ঈদের শুভেচ্ছা ও দোয়া

সাহাবায়ে কেরাম ঈদের দিনে একে অপরকে দোয়া দিতেন—

تَقَبَّلَ اللَّهُ مِنَّا وَمِنْكَ

উচ্চারণ: ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা’

অর্থ: ‘আল্লাহ আমাদের ও আপনার আমল কবুল করুন।’ (ফাতহুল বারি)

৭. ঈদের নামাজ সকাল সকাল আদায়

রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদের নামাজ দ্রুত আদায় করতেন, বিশেষত কুরবানির ঈদে। হজরত বারা ইবনে আজিব (রা.) বলেন—

‘আমাদের এ দিনের প্রথম কাজ হলো নামাজ আদায় করা, এরপর কুরবানি করা।’ (বুখারি ৯৬৮; মুসলিম)

আরও পড়ুন
কুরবানির নির্ধারিত সময় কতদিন? জেনে নিন শরিয়তের গুরুত্বপূর্ণ বিধান
কুরবানির নির্ধারিত সময় কতদিন? জেনে নিন শরিয়তের গুরুত্বপূর্ণ বিধান

৮. প্রতি বছর কুরবানি করা

নবীজি (সা.) জীবনের প্রতিটি বছর কুরবানি করেছেন। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন— ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় অবস্থানকালে প্রতি বছর কুরবানি করেছেন।’ (তিরমিজি ১৫০৭)

৯. কুরবানির পশু ও দোয়া

রাসুলুল্লাহ (সা.) সুন্দর, সুস্থ ও শিংওয়ালা দুম্বা কুরবানি করতেন। জবাইয়ের সময় তিনি পড়তেন—

إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ…

‘আমি একনিষ্ঠভাবে আমার মুখমণ্ডল সেই সত্তার দিকে ফিরালাম যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন…’ (আবু দাউদ ২৭৯৫)

১০. পশু জবেহ ও নহরের পদ্ধতি

ছাগল, ভেড়া ও গরু জবেহ করতে হয়; আর উট নহর করতে হয়। হজরত আনাস (রা.) বলেন— ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলে নিজ হাতে দুম্বা জবেহ করেছেন।’ (বুখারি ৫৫৬৫; মুসলিম)

১১. পরিবারের পক্ষ থেকেও কুরবানি

রাসুলুল্লাহ (সা.) তার স্ত্রীদের পক্ষ থেকেও কুরবানি করেছেন। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন— ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর স্ত্রীদের পক্ষ থেকে গরু কুরবানি করেছেন।’ (বুখারি, মুসলিম)

১২. কুরবানির পশুর নির্ধারিত বয়স

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— ‘তোমরা মুসিন্নাহ (নির্ধারিত বয়সের পশু) ছাড়া জবেহ করবে না।’ (মুসলিম ১৯৬৩)

পশুর বয়স হতে হবে—

> উট: কমপক্ষে ৫ বছর

> গরু/মহিষ: কমপক্ষে ২ বছর

> ছাগল: কমপক্ষে ১ বছর

> ভেড়া/দুম্বা: ৬ মাস হলেও চলবে

১৩. ত্রুটিযুক্ত পশু কুরবানি করা নিষিদ্ধ

অন্ধ, অসুস্থ, খোঁড়া বা অতিরিক্ত দুর্বল পশু কুরবানি করা যাবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— ‘চার ধরনের পশু কুরবানির উপযুক্ত নয়— স্পষ্ট কানা, স্পষ্ট রোগাক্রান্ত, স্পষ্ট খোঁড়া ও অত্যন্ত দুর্বল পশু।’ (আবু দাউদ ২৮০২, নাসাঈ)

আল্লাহ তাআলা বলেন—

لَنْ تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّىٰ تُنفِقُوا مِمَّا تُحِبُّونَ

‘তোমরা কখনো পূর্ণ নেকি লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা প্রিয় বস্তু আল্লাহর পথে ব্যয় করো।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ৯২)

১৪. গরু ও উটে সাতজন শরিক হওয়া

একটি গরু বা উটে সাতজন পর্যন্ত শরিক হতে পারে। হজরত জাবির (রা.) বলেন— ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন, একটি উট ও একটি গরুতে সাতজন করে শরিক হতে।’ (মুসলিম ১৩১৮)

১৫. পশুকে কষ্ট না দিয়ে জবেহ করা

ইসলাম প্রাণীর প্রতিও দয়া ও উত্তম আচরণের শিক্ষা দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন— ‘তোমরা যখন জবেহ করবে, উত্তম পদ্ধতিতে জবেহ করবে। ছুরিতে শান দেবে এবং পশুকে শান্তি দেবে।’ (মুসলিম ১৯৫৫)

১৬. কুরবানির গোশত সংরক্ষণ ও বণ্টন

কুরবানির গোশত খাওয়া, সংরক্ষণ ও সাদকা করা বৈধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— ‘খাও, সংরক্ষণ কর এবং সাদকা কর।’ (মুসলিম ১৯৭১)

তবে কুরবানির পশুর গোশত বা চামড়া বিক্রি করে কসাইয়ের পারিশ্রমিক দেওয়া যাবে না। (মুসলিম, বুখারি)

১৭. সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানি না করার সতর্কতা

কুরবানি সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আমল। হাদিসে পাকে এসেছে—

مَنْ كَانَ لَهُ سَعَةٌ وَلَمْ يُضَحِّ فَلَا يَقْرَبَنَّ مُصَلَّانَا

‘যার সামর্থ্য আছে অথচ কুরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছে না আসে।’ (ইবনে মাজাহ ৩১২৩)

কুরবানি শুধু পশু জবেহ করার নাম নয়; এটি আত্মত্যাগ, আনুগত্য, তাকওয়া ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক মহান ইবাদত। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো নিয়ম অনুযায়ী কুরবানি আদায় করলে এ ইবাদত পরিপূর্ণতা লাভ করে। তাই কুরবানির বাহ্যিক আয়োজনের পাশাপাশি অন্তরে তাকওয়া, আন্তরিকতা ও আল্লাহভীতি ধারণ করাই একজন মুমিনের প্রকৃত দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সুন্নাহ অনুযায়ী বিশুদ্ধভাবে কুরবানি আদায়ের তৌফিক দান করুন। আমিন।