ঢাকা ০৭:২৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং
হোম

🌤️ বাংলাদেশের বিভাগসমূহের লাইভ আবহাওয়া

বেতন বাড়লেও আয় কমার শঙ্কা, নতুন পে স্কেলে কী আছে?

নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের চার মাসের বকেয়াসহ বর্ধিত বেতন আগামী ১ নভেম্বর দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। তবে বেতন নির্ধারণের নিয়মে অসংগতি, গ্রেডের ক্রম নিয়ে জটিলতা এবং বাড়িভাড়া ভাতার হিসাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কোথাও নিচের গ্রেডের কর্মচারী বেশি মূল বেতন পাচ্ছেন, আবার কোথাও পদোন্নতি বা উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পরও মোট আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এদিকে সরকারের সমন্বিত আর্থিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি আইবাস++ এ বেতন নির্ধারণের জটিলতার কারণে অনেক কর্মকর্তা কর্মচারীর কাজ এখনো শেষ হয়নি। ফলে নির্ধারিত সময়ে নতুন কাঠামোর বর্ধিত বেতন না পেয়ে আপাতত পুরোনো কাঠামোয় বেতন পাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

অর্থ বিভাগের সূত্রের বরাতে জানা গেছে, দেশে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী, ৮ লাখ পেনশনভোগী এবং ৬ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক রয়েছেন। তাদের সবাই এখনো নতুন কাঠামোয় বেতন নির্ধারণ করতে পারেননি। যাদের বেতন নির্ধারণের কাজ শেষ হবে না, তারা আপাতত পুরোনো কাঠামোয় বেতন পাবেন। নতুন কাঠামো অনুযায়ী বকেয়া অর্থ পরে পরিশোধ করা হবে।

নতুন বেতন কাঠামোর জটিলতা নিরসনে অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারের কাছে আবেদন করা হলেও গত সোমবার পর্যন্ত সেগুলোর সুরাহা হয়নি। অর্থ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়সহ কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে সমস্যা রয়েছে। এসব সমস্যার সবকটির সমাধান ১ নভেম্বরের আগে করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।

গ্রেড নিচে, বেতন বেশি হওয়ার আশঙ্কা

নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন ও কর্মকর্তা কর্মচারীদের দেওয়া হিসাব বিশ্লেষণে গ্রেডভিত্তিক বেতনের স্বাভাবিক ক্রমে অসংগতির বিষয়টি সামনে এসেছে।

নতুন কাঠামোয় ১১তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২৫ হাজার টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ২৪ হাজার ৩০০ টাকা। অর্থাৎ প্রারম্ভিক মূল বেতনে ১১তম গ্রেড এগিয়ে ৭০০ টাকা। কিন্তু পুরোনো কাঠামোয় পাওয়া বেতন নতুন কাঠামোয় সমন্বয়ের পর চিত্রটি উল্টো হয়ে যাচ্ছে।

কর্মচারীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ১১তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর ২০১৫ সালের প্রারম্ভিক মূল বেতন ছিল ১২ হাজার ৫০০ টাকা। গত ৩০ জুন তার মূল বেতন দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৬৬০ টাকা। অর্থাৎ পুরোনো কাঠামোয় মূল বেতন বেড়েছিল ১১ হাজার ১৬০ টাকা।

নতুন কাঠামোর ২৫ হাজার টাকা প্রারম্ভিক বেতনের সঙ্গে এই বৃদ্ধি যোগ করলে হয় ৩৬ হাজার ১৬০ টাকা। কিন্তু নতুন কাঠামোয় ওই অঙ্কের বেতনধাপ না থাকায় পরবর্তী ধাপ অনুযায়ী তার মূল বেতন নির্ধারণ হচ্ছে ৩৭ হাজার টাকা।

অন্যদিকে, ১২তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর ২০১৫ সালের প্রারম্ভিক মূল বেতন ছিল ১১ হাজার ৩০০ টাকা। গত ৩০ জুন তার মূল বেতন দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৫৮০ টাকা। অর্থাৎ পুরোনো কাঠামোয় তার মূল বেতন বেড়েছিল ১২ হাজার ২৮০ টাকা।

নতুন কাঠামোর ২৪ হাজার ৩০০ টাকা প্রারম্ভিক বেতনের সঙ্গে এই বৃদ্ধি যোগ করলে হয় ৩৬ হাজার ৫৮০ টাকা। পরবর্তী বেতনধাপ অনুযায়ী তার মূল বেতন নির্ধারণ হচ্ছে ৩৭ হাজার ৭০০ টাকা।

ফলে নতুন কাঠামোয় ১১তম গ্রেডের কর্মচারীর মূল বেতন দাঁড়াচ্ছে ৩৭ হাজার টাকা, আর ১২তম গ্রেডের কর্মচারীর ৩৭ হাজার ৭০০ টাকা। অর্থাৎ প্রারম্ভিক বেতনে এগিয়ে থাকা ১১তম গ্রেডের কর্মচারী বেতন নির্ধারণের পর ১২তম গ্রেডের কর্মচারীর চেয়ে ৭০০ টাকা কম পাচ্ছেন।

কর্মচারীদের দাবি, নতুন কাঠামোর সুবিধা পর্যায়ক্রমে কার্যকর হলেও গ্রেডভিত্তিক বেতনের এই ব্যবধান পুরোপুরি দূর হচ্ছে না।

পর্যায়ক্রমে বেতন বাড়লেও থাকছে ব্যবধান

নতুন প্রজ্ঞাপনের অনুচ্ছেদ ৫ ও ৯ অনুযায়ী, ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে বেতন নির্ধারণ করে নতুন নির্ধারিত বেতন ও বর্তমান বেতনের পার্থক্যের ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে ৫০, ৭৫ ও ১০০ শতাংশ সুবিধা কার্যকরের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

কর্মচারীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ১ জুলাই ২০২৬ থেকে প্রথম পর্যায়ে ৫০ শতাংশ সুবিধা কার্যকর হলে ১১তম গ্রেডের মূল বেতন দাঁড়াবে ৩১ হাজার ২৩০ টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ৩১ হাজার ৫৯০ টাকা। এতে ১২তম গ্রেডের কর্মচারী ৩৬০ টাকা বেশি পাবেন।

একইভাবে, ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে ৭৫ শতাংশ সুবিধা কার্যকর হলে ১১তম গ্রেডের মূল বেতন হবে ৩৫ হাজার ১৫ টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ৩৫ হাজার ৫৯৫ টাকা। তখন ব্যবধান দাঁড়াবে ৫৮০ টাকা।

আর ১ জুলাই ২০২৭ থেকে শতভাগ সুবিধা কার্যকর হলে ১১তম গ্রেডের মূল বেতন হবে ৪০ হাজার ৮০০ টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ৪১ হাজার ৬০০ টাকা। সে ক্ষেত্রে ব্যবধান বেড়ে দাঁড়াবে ৮০০ টাকা।

কর্মচারীদের অভিযোগ, বেতন নির্ধারণের এই পদ্ধতিতে গ্রেডের স্বাভাবিক ক্রম বজায় থাকছে না। ফলে একই ধরনের অসংগতি অন্য গ্রেডেও দেখা দিতে পারে।

পদোন্নতির পরও কমতে পারে মোট আয়

নতুন কাঠামোয় বাড়িভাড়া ভাতার হিসাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কর্মকর্তা কর্মচারীরা। তাদের দেওয়া একটি হিসাব অনুযায়ী, দশম গ্রেডের একজন কর্মকর্তা ১০ বছর চাকরি পূর্ণ করার পর নবম গ্রেডে পদোন্নতি বা প্রথম উচ্চতর গ্রেড পেলে তার মূল বেতন ৪৯ হাজার ৭০০ টাকা থেকে বেড়ে ৫১ হাজার টাকা হবে। অর্থাৎ মূল বেতন বাড়বে ১ হাজার ৩০০ টাকা।

কিন্তু গ্রেড পরিবর্তনের সঙ্গে বাড়িভাড়া ভাতার হার কমে যাওয়ায় মোট আয় কমতে পারে।

দশম গ্রেডে ৪৯ হাজার ৭০০ টাকা মূল বেতনের ওপর ৫০ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া ভাতা হয় ২৪ হাজার ৮৫০ টাকা। নবম গ্রেডে ৫১ হাজার টাকা মূল বেতনের ওপর ৪৫ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া ভাতা হয় ২২ হাজার ৯৫০ টাকা।

অর্থাৎ পদোন্নতি বা উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পর মূল বেতন ১ হাজার ৩০০ টাকা বাড়লেও বাড়িভাড়া ভাতা কমবে ১ হাজার ৯০০ টাকা। এতে মূল বেতন ও বাড়িভাড়া ভাতা মিলিয়ে মাসিক আয় ৬০০ টাকা কমে যেতে পারে।

কর্মচারীদের আশঙ্কা, একই ধরনের সমস্যা অন্য গ্রেডেও দেখা দিতে পারে। ফলে পদোন্নতি বা উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার আর্থিক সুবিধা নিয়ে নতুন করে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে।

উচ্চতর গ্রেড নিয়ে জ্যেষ্ঠতা সংক্রান্ত প্রশ্ন

উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্যতা ও সময় নির্ধারণের নিয়ম নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন কর্মকর্তা কর্মচারীরা। তাদের অভিযোগ, ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে যাদের চাকরির বয়স আট বছর পূর্ণ হয়েছে এবং যাদের ১০ বছর পূর্ণ হয়েছে, তারা উভয়েই ১ জুলাই থেকে প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্য হতে পারেন।

এতে একই গ্রেডের জ্যেষ্ঠ ও জুনিয়র কর্মকর্তার মূল বেতন সমান হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আবার বেতন নির্ধারণের ধাপের কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে জুনিয়র কর্মকর্তার বেতন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার চেয়েও বেশি হতে পারে।

কর্মচারীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, দুবার উচ্চতর গ্রেড পেতে একজন জুনিয়র কর্মকর্তার ১৪ বছর লাগলেও একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার ক্ষেত্রে লাগতে পারে ১৬ বছর। তাদের মতে, উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্যতা ও সময় নির্ধারণের নিয়ম স্পষ্ট না হলে এ ধরনের অসংগতি দূর করা কঠিন হবে।

আইবাস++ এর জটিলতায় আটকে বেতন নির্ধারণ

নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে আইবাস++ ব্যবস্থার জটিলতাও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন কর্মকর্তা কর্মচারীরা। তাদের দাবি, বেতন নির্ধারণের কাজে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের যথাযথভাবে কাজে লাগানো হয়নি। অভিজ্ঞ জনবলের ঘাটতি ও নতুন কর্মকর্তাদের অনভিজ্ঞতার কারণে অনেকের বেতন নির্ধারণের কাজ এখনো শেষ হয়নি।

আইবাস++ সরকারের সমন্বিত আর্থিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি। বাজেট ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণ, বিল তৈরি, অর্থ পরিশোধ এবং সরকারি আয় ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণে এ ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর নতুন জাতীয় বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি হয়। ৫ অক্টোবর থেকে বেতন নির্ধারণের কাজ শুরু হলেও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অনেক কর্মকর্তা কর্মচারী এখনো তা শেষ করতে পারেননি। তাদের অভিযোগ, বেতন নির্ধারণের নিয়ম প্রয়োগ করতে গিয়ে গ্রেডের স্বাভাবিক ক্রম, উচ্চতর গ্রেড এবং বাড়িভাড়া ভাতার হিসাবে অসংগতি দেখা দিয়েছে।

নতুন কাঠামোর জটিলতা নিয়ে জানতে চাইলে অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে অর্থ বিভাগের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণমাধ্যমকে বলেন, প্রজ্ঞাপন তৈরি ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জানাশোনার ঘাটতির কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সমস্যাগুলোর সমাধানে কাজ চলছে এবং এ ক্ষেত্রে অতীতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে।

আগামী ১ নভেম্বর থেকে বর্ধিত বেতন দেওয়ার পরিকল্পনা থাকায় দ্রুত অসংগতিগুলো দূর করার দাবি জানিয়েছেন কর্মকর্তা কর্মচারীরা। তাদের মতে, বেতন নির্ধারণের নিয়ম, গ্রেডের ক্রম, উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্যতা এবং বাড়িভাড়া ভাতার হিসাব পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা জরুরি।

তারা বলছেন, নিয়মগুলো স্পষ্ট করে অসংগতি দূর করা গেলে জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতির আর্থিক সুবিধা নিয়ে বিরোধ কমবে। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ে সবার বেতন নির্ধারণ এবং বকেয়া অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়াও সহজ হবে। তবে ১ নভেম্বরের আগে সব সমস্যার সমাধান না হলে অনেক কর্মকর্তা কর্মচারীকে নতুন কাঠামোর বর্ধিত বেতন পেতে আরও অপেক্ষা করতে হতে পারে।

নিউজ বিজয় ২৪ডট কম/এফএইচএন
আপলোডকারির তথ্য

NewsBijoy24. Com

📰 নিউজবিজয়২৪.কম এমন একটি অনলাইন সংবাদপত্র, যার প্রতিটি শব্দে জড়িয়ে আছে সত্যের অঙ্গীকার ও মানবিকতার দায়বদ্ধতা। এই পত্রিকাটি উৎসর্গ করা হলো আমার পরম শ্রদ্ধেয় মা ও বাবার পবিত্র স্মৃতির উদ্দেশ্যে-যারা আজ এই পৃথিবীতে নেই, কিন্তু তাদের শিক্ষা, আদর্শ ও দোয়ার আলো আজও আমাদের পথ দেখায়। তাদের নিঃস্বার্থ ত্যাগ ও ভালোবাসার প্রেরণায় প্রতিষ্ঠিত এই সংবাদমাধ্যমের লক্ষ্য সত্য প্রকাশ, অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং মানুষের পাশে নির্ভীকভাবে দাঁড়ানো। হে আল্লাহ, আমার মা-বাবাকে জান্নাতুল ফেরদৌসে উচ্চ মাকাম দান করুন। আমিন। NewsBijoy24.Com 📰 সত্যের পথে, বিশ্বাসের সাথে।
জনপ্রিয় সংবাদ
⚽ আজকের সেরা ম্যাচগুলো ও লাইভ স্কোর

রমজানের আগেই তেলের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা ব্যবসায়ীদের!

বেতন বাড়লেও আয় কমার শঙ্কা, নতুন পে স্কেলে কী আছে?

আপডেট সময় ০৫:৪৮:২৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের চার মাসের বকেয়াসহ বর্ধিত বেতন আগামী ১ নভেম্বর দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। তবে বেতন নির্ধারণের নিয়মে অসংগতি, গ্রেডের ক্রম নিয়ে জটিলতা এবং বাড়িভাড়া ভাতার হিসাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কোথাও নিচের গ্রেডের কর্মচারী বেশি মূল বেতন পাচ্ছেন, আবার কোথাও পদোন্নতি বা উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পরও মোট আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

🔔 নিউজ বিজয়ের সর্বশেষ খবর পেতে টেলিগ্রাম চ্যানেল জয়েন করুন

এদিকে সরকারের সমন্বিত আর্থিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি আইবাস++ এ বেতন নির্ধারণের জটিলতার কারণে অনেক কর্মকর্তা কর্মচারীর কাজ এখনো শেষ হয়নি। ফলে নির্ধারিত সময়ে নতুন কাঠামোর বর্ধিত বেতন না পেয়ে আপাতত পুরোনো কাঠামোয় বেতন পাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

অর্থ বিভাগের সূত্রের বরাতে জানা গেছে, দেশে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী, ৮ লাখ পেনশনভোগী এবং ৬ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক রয়েছেন। তাদের সবাই এখনো নতুন কাঠামোয় বেতন নির্ধারণ করতে পারেননি। যাদের বেতন নির্ধারণের কাজ শেষ হবে না, তারা আপাতত পুরোনো কাঠামোয় বেতন পাবেন। নতুন কাঠামো অনুযায়ী বকেয়া অর্থ পরে পরিশোধ করা হবে।

নতুন বেতন কাঠামোর জটিলতা নিরসনে অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারের কাছে আবেদন করা হলেও গত সোমবার পর্যন্ত সেগুলোর সুরাহা হয়নি। অর্থ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়সহ কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে সমস্যা রয়েছে। এসব সমস্যার সবকটির সমাধান ১ নভেম্বরের আগে করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।

গ্রেড নিচে, বেতন বেশি হওয়ার আশঙ্কা

নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন ও কর্মকর্তা কর্মচারীদের দেওয়া হিসাব বিশ্লেষণে গ্রেডভিত্তিক বেতনের স্বাভাবিক ক্রমে অসংগতির বিষয়টি সামনে এসেছে।

নতুন কাঠামোয় ১১তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২৫ হাজার টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ২৪ হাজার ৩০০ টাকা। অর্থাৎ প্রারম্ভিক মূল বেতনে ১১তম গ্রেড এগিয়ে ৭০০ টাকা। কিন্তু পুরোনো কাঠামোয় পাওয়া বেতন নতুন কাঠামোয় সমন্বয়ের পর চিত্রটি উল্টো হয়ে যাচ্ছে।

কর্মচারীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ১১তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর ২০১৫ সালের প্রারম্ভিক মূল বেতন ছিল ১২ হাজার ৫০০ টাকা। গত ৩০ জুন তার মূল বেতন দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৬৬০ টাকা। অর্থাৎ পুরোনো কাঠামোয় মূল বেতন বেড়েছিল ১১ হাজার ১৬০ টাকা।

নতুন কাঠামোর ২৫ হাজার টাকা প্রারম্ভিক বেতনের সঙ্গে এই বৃদ্ধি যোগ করলে হয় ৩৬ হাজার ১৬০ টাকা। কিন্তু নতুন কাঠামোয় ওই অঙ্কের বেতনধাপ না থাকায় পরবর্তী ধাপ অনুযায়ী তার মূল বেতন নির্ধারণ হচ্ছে ৩৭ হাজার টাকা।

অন্যদিকে, ১২তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর ২০১৫ সালের প্রারম্ভিক মূল বেতন ছিল ১১ হাজার ৩০০ টাকা। গত ৩০ জুন তার মূল বেতন দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৫৮০ টাকা। অর্থাৎ পুরোনো কাঠামোয় তার মূল বেতন বেড়েছিল ১২ হাজার ২৮০ টাকা।

নতুন কাঠামোর ২৪ হাজার ৩০০ টাকা প্রারম্ভিক বেতনের সঙ্গে এই বৃদ্ধি যোগ করলে হয় ৩৬ হাজার ৫৮০ টাকা। পরবর্তী বেতনধাপ অনুযায়ী তার মূল বেতন নির্ধারণ হচ্ছে ৩৭ হাজার ৭০০ টাকা।

ফলে নতুন কাঠামোয় ১১তম গ্রেডের কর্মচারীর মূল বেতন দাঁড়াচ্ছে ৩৭ হাজার টাকা, আর ১২তম গ্রেডের কর্মচারীর ৩৭ হাজার ৭০০ টাকা। অর্থাৎ প্রারম্ভিক বেতনে এগিয়ে থাকা ১১তম গ্রেডের কর্মচারী বেতন নির্ধারণের পর ১২তম গ্রেডের কর্মচারীর চেয়ে ৭০০ টাকা কম পাচ্ছেন।

কর্মচারীদের দাবি, নতুন কাঠামোর সুবিধা পর্যায়ক্রমে কার্যকর হলেও গ্রেডভিত্তিক বেতনের এই ব্যবধান পুরোপুরি দূর হচ্ছে না।

পর্যায়ক্রমে বেতন বাড়লেও থাকছে ব্যবধান

নতুন প্রজ্ঞাপনের অনুচ্ছেদ ৫ ও ৯ অনুযায়ী, ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে বেতন নির্ধারণ করে নতুন নির্ধারিত বেতন ও বর্তমান বেতনের পার্থক্যের ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে ৫০, ৭৫ ও ১০০ শতাংশ সুবিধা কার্যকরের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

কর্মচারীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ১ জুলাই ২০২৬ থেকে প্রথম পর্যায়ে ৫০ শতাংশ সুবিধা কার্যকর হলে ১১তম গ্রেডের মূল বেতন দাঁড়াবে ৩১ হাজার ২৩০ টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ৩১ হাজার ৫৯০ টাকা। এতে ১২তম গ্রেডের কর্মচারী ৩৬০ টাকা বেশি পাবেন।

একইভাবে, ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে ৭৫ শতাংশ সুবিধা কার্যকর হলে ১১তম গ্রেডের মূল বেতন হবে ৩৫ হাজার ১৫ টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ৩৫ হাজার ৫৯৫ টাকা। তখন ব্যবধান দাঁড়াবে ৫৮০ টাকা।

আর ১ জুলাই ২০২৭ থেকে শতভাগ সুবিধা কার্যকর হলে ১১তম গ্রেডের মূল বেতন হবে ৪০ হাজার ৮০০ টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ৪১ হাজার ৬০০ টাকা। সে ক্ষেত্রে ব্যবধান বেড়ে দাঁড়াবে ৮০০ টাকা।

কর্মচারীদের অভিযোগ, বেতন নির্ধারণের এই পদ্ধতিতে গ্রেডের স্বাভাবিক ক্রম বজায় থাকছে না। ফলে একই ধরনের অসংগতি অন্য গ্রেডেও দেখা দিতে পারে।

পদোন্নতির পরও কমতে পারে মোট আয়

নতুন কাঠামোয় বাড়িভাড়া ভাতার হিসাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কর্মকর্তা কর্মচারীরা। তাদের দেওয়া একটি হিসাব অনুযায়ী, দশম গ্রেডের একজন কর্মকর্তা ১০ বছর চাকরি পূর্ণ করার পর নবম গ্রেডে পদোন্নতি বা প্রথম উচ্চতর গ্রেড পেলে তার মূল বেতন ৪৯ হাজার ৭০০ টাকা থেকে বেড়ে ৫১ হাজার টাকা হবে। অর্থাৎ মূল বেতন বাড়বে ১ হাজার ৩০০ টাকা।

কিন্তু গ্রেড পরিবর্তনের সঙ্গে বাড়িভাড়া ভাতার হার কমে যাওয়ায় মোট আয় কমতে পারে।

দশম গ্রেডে ৪৯ হাজার ৭০০ টাকা মূল বেতনের ওপর ৫০ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া ভাতা হয় ২৪ হাজার ৮৫০ টাকা। নবম গ্রেডে ৫১ হাজার টাকা মূল বেতনের ওপর ৪৫ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া ভাতা হয় ২২ হাজার ৯৫০ টাকা।

অর্থাৎ পদোন্নতি বা উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পর মূল বেতন ১ হাজার ৩০০ টাকা বাড়লেও বাড়িভাড়া ভাতা কমবে ১ হাজার ৯০০ টাকা। এতে মূল বেতন ও বাড়িভাড়া ভাতা মিলিয়ে মাসিক আয় ৬০০ টাকা কমে যেতে পারে।

কর্মচারীদের আশঙ্কা, একই ধরনের সমস্যা অন্য গ্রেডেও দেখা দিতে পারে। ফলে পদোন্নতি বা উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার আর্থিক সুবিধা নিয়ে নতুন করে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে।

উচ্চতর গ্রেড নিয়ে জ্যেষ্ঠতা সংক্রান্ত প্রশ্ন

উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্যতা ও সময় নির্ধারণের নিয়ম নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন কর্মকর্তা কর্মচারীরা। তাদের অভিযোগ, ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে যাদের চাকরির বয়স আট বছর পূর্ণ হয়েছে এবং যাদের ১০ বছর পূর্ণ হয়েছে, তারা উভয়েই ১ জুলাই থেকে প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্য হতে পারেন।

এতে একই গ্রেডের জ্যেষ্ঠ ও জুনিয়র কর্মকর্তার মূল বেতন সমান হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আবার বেতন নির্ধারণের ধাপের কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে জুনিয়র কর্মকর্তার বেতন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার চেয়েও বেশি হতে পারে।

কর্মচারীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, দুবার উচ্চতর গ্রেড পেতে একজন জুনিয়র কর্মকর্তার ১৪ বছর লাগলেও একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার ক্ষেত্রে লাগতে পারে ১৬ বছর। তাদের মতে, উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্যতা ও সময় নির্ধারণের নিয়ম স্পষ্ট না হলে এ ধরনের অসংগতি দূর করা কঠিন হবে।

আইবাস++ এর জটিলতায় আটকে বেতন নির্ধারণ

নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে আইবাস++ ব্যবস্থার জটিলতাও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন কর্মকর্তা কর্মচারীরা। তাদের দাবি, বেতন নির্ধারণের কাজে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের যথাযথভাবে কাজে লাগানো হয়নি। অভিজ্ঞ জনবলের ঘাটতি ও নতুন কর্মকর্তাদের অনভিজ্ঞতার কারণে অনেকের বেতন নির্ধারণের কাজ এখনো শেষ হয়নি।

আইবাস++ সরকারের সমন্বিত আর্থিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি। বাজেট ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণ, বিল তৈরি, অর্থ পরিশোধ এবং সরকারি আয় ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণে এ ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর নতুন জাতীয় বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি হয়। ৫ অক্টোবর থেকে বেতন নির্ধারণের কাজ শুরু হলেও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অনেক কর্মকর্তা কর্মচারী এখনো তা শেষ করতে পারেননি। তাদের অভিযোগ, বেতন নির্ধারণের নিয়ম প্রয়োগ করতে গিয়ে গ্রেডের স্বাভাবিক ক্রম, উচ্চতর গ্রেড এবং বাড়িভাড়া ভাতার হিসাবে অসংগতি দেখা দিয়েছে।

নতুন কাঠামোর জটিলতা নিয়ে জানতে চাইলে অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে অর্থ বিভাগের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণমাধ্যমকে বলেন, প্রজ্ঞাপন তৈরি ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জানাশোনার ঘাটতির কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সমস্যাগুলোর সমাধানে কাজ চলছে এবং এ ক্ষেত্রে অতীতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে।

আগামী ১ নভেম্বর থেকে বর্ধিত বেতন দেওয়ার পরিকল্পনা থাকায় দ্রুত অসংগতিগুলো দূর করার দাবি জানিয়েছেন কর্মকর্তা কর্মচারীরা। তাদের মতে, বেতন নির্ধারণের নিয়ম, গ্রেডের ক্রম, উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্যতা এবং বাড়িভাড়া ভাতার হিসাব পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা জরুরি।

তারা বলছেন, নিয়মগুলো স্পষ্ট করে অসংগতি দূর করা গেলে জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতির আর্থিক সুবিধা নিয়ে বিরোধ কমবে। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ে সবার বেতন নির্ধারণ এবং বকেয়া অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়াও সহজ হবে। তবে ১ নভেম্বরের আগে সব সমস্যার সমাধান না হলে অনেক কর্মকর্তা কর্মচারীকে নতুন কাঠামোর বর্ধিত বেতন পেতে আরও অপেক্ষা করতে হতে পারে।