বাংলাদেশে সম্প্রতি শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এখন নয় মাসের বদলে ছয় মাস বয়সী শিশুদের হামের টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হবে। এর আগে সম্প্রসারিত টিকাদান (ইপিআই) কর্মসূচি অনুযায়ী শিশুকে নয় মাস এবং ১৫ মাস বয়সে হামের টিকা দেওয়া হতো।
প্রশ্ন হচ্ছে— ছয় কিংবা নয় মাসের আগেই যদি কোনো শিশু হাম বা মিজলস ভাইরাসে আক্রান্ত হয়, তখন করণীয় কী?
ঝুঁকিতে কারা বেশি?
চিকিৎসকদের মতে, নয় মাস বয়সের আগেও শিশুরা হামে আক্রান্ত হতে পারে—বিশেষ করে যদি তারা ঝুঁকিপূর্ণ গ্রুপে পড়ে।
মেডিসিন বিশেষজ্ঞদের মতে, যেসব শিশু এখনো টিকা নেয়নি, বিশেষ করে ১৫ মাসের কম বয়সী বা যারা এক বা দুই ডোজের কোনোটি নেয়নি, তাদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে।
অপুষ্টিতে ভোগা শিশু কিংবা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি।
বুকের দুধ পান করার মাধ্যমে শিশুর শরীরে মায়ের কাছ থেকে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। তবে এই সুরক্ষা সব শিশুর ক্ষেত্রে সমানভাবে কার্যকর হয় না।
যেসব শিশু এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিং পায় না বা যাদের পুষ্টিহীনতা রয়েছে, তাদের ইমিউনিটি তুলনামূলকভাবে দুর্বল থাকে— ফলে সংক্রমণের সম্ভাবনা বাড়ে।
৯ মাসের আগে টিকা দেওয়া যাবে?
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, বর্তমানে বিভিন্ন এলাকায় হাম ছড়িয়ে পড়ায় (আউটব্রেক পরিস্থিতি) ঝুঁকি বেড়েছে। এ অবস্থায় কোনো শিশু যদি নিশ্চিতভাবে সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসে, তাহলে বিশেষ বিবেচনায় ছয় মাস বয়সী শিশুকেও টিকা দেওয়া যেতে পারে।
দেশে হামের সংক্রমণ বাড়তে থাকায় সরকার এখন ৯ মাসের পরিবর্তে ছয় মাস বয়সেই প্রথম ডোজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার এক পরিচালক গণমাধ্যমকে জানান, ন্যাশনাল ইমিউনাইজেশন টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি কমিটির বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এতদিন দেশে ৯ মাসে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হতো। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এই বয়স কমিয়ে আনা হয়েছে।
এছাড়া একটি বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে প্রায় ২ কোটি শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
টিকা নেওয়ার পরও কেন হাম হয়?
হামের টিকা প্রায় ৯০–৯৫ শতাংশ কার্যকর হলেও কিছু ক্ষেত্রে সংক্রমণ হতে পারে। বিশেষ করে যেসব শিশু—
> অপুষ্টিতে ভোগে
> দীর্ঘদিন পুষ্টির অভাবে আছে
> ভিটামিন এ-এর ঘাটতি রয়েছে
> অন্য কোনো জটিল রোগে আক্রান্ত
তাদের ক্ষেত্রে টিকা নেওয়ার পরও হাম হতে পারে। তবে টিকা নেওয়া থাকলে রোগের জটিলতা অনেকটাই কম থাকে।
জটিলতা কতটা ভয়ংকর হতে পারে?
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, টিকা না নেওয়া বা দুর্বল ইমিউনিটির শিশুদের ক্ষেত্রে হাম মারাত্মক আকার নিতে পারে। সম্ভাব্য জটিলতাগুলো হলো—
> নিউমোনিয়া
> মারাত্মক ডায়রিয়া
> শরীরে ভিটামিন এ-এর ঘাটতি
> মধ্যকর্ণের সংক্রমণ
> কিছু ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে সংক্রমণ
অন্যদিকে, টিকা নেওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে সাধারণত বিশ্রাম, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ এবং ভিটামিন-এ সহায়তায় রোগ সেরে যায়।
র্যাশ ওঠার আগেই কীভাবে বুঝবেন?
হামের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো— আমরা সাধারণত র্যাশ (লাল দাগ) দেখেই রোগটি শনাক্ত করি। কিন্তু বাস্তবে র্যাশ ওঠার ৩–৫ দিন আগেই সংক্রমণ শুরু হয়ে যায়। এই সময়েই আক্রান্ত ব্যক্তি অন্যদের মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে দেয়।
প্রাথমিক লক্ষণগুলো হতে পারে—
> জ্বর
> কাশি ও সর্দি
> গলা ব্যথা
> শুকনো কাশি
> চোখ লাল হওয়া (কনজাংক্টিভাইটিস)
> চোখ দিয়ে পানি পড়া
এই লক্ষণগুলো অনেক সময় সাধারণ ঠাণ্ডা-জ্বর মনে করে অবহেলা করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে এসব উপসর্গ দেখা গেলে— বিশেষ করে স্কুলগামী শিশুদের ক্ষেত্রে—তাদের বাড়িতে রাখা এবং অন্যদের থেকে আলাদা রাখা জরুরি।
হাম কীভাবে ছড়ায়?
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ।
> এটি হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ছড়ায়
> বাতাসে ছড়িয়ে পড়া ড্রপলেটের মাধ্যমে সংক্রমণ হয়
> একজন আক্রান্ত ব্যক্তি ১২–১৮ জন পর্যন্ত মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে
হাম প্রতিরোধে করণীয়
হাম প্রতিরোধে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ—
> সময়মতো টিকা নিশ্চিত করুন (বর্তমানে ৬ মাস থেকে শুরু)
> শিশুকে এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিং দিন (প্রথম ৬ মাস)
> পুষ্টিকর খাবার ও ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ খাদ্য দিন
> আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত আলাদা রাখুন
> ভিড় এড়িয়ে চলুন (বিশেষ করে প্রাদুর্ভাবের সময়)
> নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন
> হাঁচি-কাশির সময় রুমাল/টিস্যু ব্যবহার শেখান
> ঘরের বাতাস চলাচল ঠিক রাখুন
সচেতন থাকুন
বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ সর্দি-কাশিকেও অবহেলা করা ঠিক নয়। শিশুর মধ্যে উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে এবং তাকে অন্যদের সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখতে হবে।
পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান— দুই জায়গাতেই শিশুদের হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার শেখানো জরুরি।
অনলাইন ডেস্ক : 


























