লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় গত রোববার বিএনপি ও জামায়াতের সংঘর্ষে ২–৩ জন সাংবাদিক লাঠির আঘাতে আহত হওয়ার ঘটনা কোনো গুজব নয়, এটি এক নির্মম ও উদ্বেগজনক বাস্তবতা। সহিংস রাজনৈতিক সংঘাতে সাংবাদিক আহত হওয়া নতুন কিছু নয়, কিন্তু এই ঘটনায় যে বিষয়টি সাংবাদিক সমাজকে সবচেয়ে বেশি লজ্জিত ও বিচলিত করেছে, তা হলো—ঘটনার পেছনে কিছু সাংবাদিকের পক্ষপাতদুষ্ট ভূমিকার অভিযোগ।
আলোচনায় এসেছে, সংঘর্ষের সময় কেউ বিএনপিকে, কেউ জামায়াতকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছেন। ফলাফল—দুই পক্ষই আজ সাংবাদিকদের ওপর ক্ষুব্ধ। এর পরিণতিতে পেশাগত পরিচয় বহন করেও সাংবাদিকরা হয়ে উঠেছেন আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু। এই বাস্তবতা আমাদের সামনে একটি অস্বস্তিকর কিন্তু জরুরি প্রশ্ন দাঁড় করিয়ে দিয়েছে—আমরা কি সত্যিই সাংবাদিক, নাকি রাজনৈতিক কর্মী?
সাংবাদিকতার মৌলিক দায়িত্ব হলো সত্য প্রকাশ, নিরপেক্ষতা বজায় রাখা এবং জনস্বার্থ রক্ষা করা। কিন্তু যখন কোনো সাংবাদিক দলীয় আনুগত্যকে পেশাগত নীতির ঊর্ধ্বে স্থান দেন, তখন কলমের মর্যাদা লুপ্ত হয়, ভেঙে পড়ে বিশ্বাসযোগ্যতা। সাংবাদিকতা তখন আর সত্যের বাহক থাকে না, হয়ে ওঠে সংঘাতের অংশীদার।
হাতীবান্ধার ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে—রাজনীতি আর সাংবাদিকতা একসঙ্গে চলতে পারে না। যে সাংবাদিক নিজেকে কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী হিসেবে উপস্থাপন করেন, তিনি শুধু নিজের নিরাপত্তাই নয়, পুরো পেশার সম্মান ও বিশ্বাসযোগ্যতাকেও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেন। এ কারণেই আজ মাঠে সাংবাদিক পরিচয় দিলেও নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকে না; বরং সন্দেহ, অবিশ্বাস এবং হামলার শিকার হতে হয়।
এই সহিংসতার আবহে এলাকায় এক ধরনের সামাজিক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে—যা সংক্রমণের মতো দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। ক্ষোভ, উত্তেজনা ও সহিংসতার এই পরিবেশে ঝুঁকিতে পড়ছেন শুধু রাজনৈতিক কর্মীরা নন, সাধারণ মানুষ ও সাংবাদিকরাও। তাই এখন সময় এসেছে আবেগ নয়, বিবেক দিয়ে ভাবার; দল নয়, পেশাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার।
আজ আমাদের স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আমরা সংবাদকর্মী, না রাজনৈতিক কর্মী? কলম যদি লাঠিতে রূপ নেয়, তবে সত্যের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ হয়ে যায়। আত্মসমালোচনার এই সময়টিকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সাংবাদিকতা মানে কারও পক্ষে দাঁড়ানো নয়, সাংবাদিকতা মানে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো।
দলীয় ব্যানারে নয়, পেশাগত নীতির ব্যানারেই দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের আবার মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। অন্যথায় হাতীবান্ধার এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা হয়ে থাকবে না—এটি সাংবাদিকতার ভবিষ্যতের জন্য এক ভয়ংকর সতর্কবার্তা হিসেবেই ইতিহাসে লেখা থাকবে।
মো: ফারুক হোসেন (নিশাত) নিউজবিজয় প্রতিবেদক 

































