সম্প্রতি এক ওয়াজ মাহফিলে এক ব্যক্তি শায়খ আহমাদুল্লাহকে প্রশ্ন করেন, ওয়ারিশদের সম্পদ ওয়ারিশদের না দিলে তাদের পরিণতি কী হবে? উদাহরণস্বরূপ, একজন বোন শরিয়তের বিধানমতে প্রায় ৪০ শতক জমি পান, কিন্তু ভাইয়েরা তাকে ২০ শতক জমি দেন। কারণ হিসেবে বলা হয়, বোন ভাইয়ের বাড়িতে বেড়াতে আসবেন, তাই কিছু অংশ রেখে দেওয়া হলো। শরিয়তে এর বিধান কী?
উত্তরে শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, আমাদের দেশে বেশিরভাগ পরিবারেই এই অবস্থা দেখা যায় যে, বাবা-মার সম্পদে মেয়েদের অধিকার পুরোপুরি দেওয়া হয় না। লামসাম বা নামকাওয়াস্তে একটু-আধটু কিছু দিয়ে বিদায় করা হয়, আর বাকি প্রপার্টি ভাইয়েরা রেখে দেয়। অজুহাত হিসেবে বলা হয়, মেয়েরা তো বাপের বাড়িতে আসবে, তাহলে তারা খাবে কী, ভোগ করবে কী? তাই তাদের অংশের কিছু সম্পদ বাপের বাড়িতেই থাকুক!
এর চেয়ে বড় মূর্খতা ও ভুল কাজ আর দ্বিতীয়টি হতে পারে না। একজন বোন তার বাবার বাড়িতে বা ভাইয়ের বাড়িতে আজীবন বেড়াতে আসবেন এটি তো রক্তের সম্পর্কের দাবি, ভালোবাসার দাবি। আমার বোন আমার কাছ থেকে তার শরিয়তসম্মত পুরো হক ও পাওনা বুঝে নিয়ে গেছেন, তাই বলে কি ভাই-বোনের সম্পর্ক শেষ হয়ে গেছে? জীবন থাকা পর্যন্ত বোন ভাইয়ের কাছে আসবে, ভাই বোনের কাছে যাবে।
সে বাপের বাড়িতে বেড়াতে আসবে বলে যদি তার সম্পদ কেটে রেখে দেওয়া হয়, তবে তা তো ভাড়ার মতো বিষয় হয়ে গেল যে, এসে খাবে বলে আগে থেকে অংশ কেটে রাখা হলো!
এটি সুস্পষ্ট অন্যায় এবং ঘোর অবিচার। বোনদের তাদের বাবা-মায়ের সম্পদের অংশ পাই পাই করে বুঝিয়ে দিতে হবে।
আমাদের সমাজে বোনদের হক পরিপূর্ণ বুঝিয়ে দিয়েছেন এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। আমি বিভিন্ন মাহফিলে যখন জিজ্ঞাসা করি, ‘আপনাদের এই গ্রামের মধ্যে কে কে বুক ফুলিয়ে হাত তুলে বলতে পারবেন যে, বাবার মৃত্যুর পর জমিজমা, ভিটাবাড়ি, ব্যাংক ব্যালেন্স ও প্রপার্টি থেকে বোনের পাওনা কড়ায়-গণ্ডায় বুঝিয়ে দিয়েছেন?’ দেখা যায় এত বড় মাহফিলের মধ্যেও একজন মানুষও হাত তুলতে পারেন না!
একটু চিন্তা করে দেখুন, অবস্থা কতটা সঙ্গীন হয়ে গেছে। শুধু মুখে ‘সুবহানাল্লাহ’ বা ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বললেই জান্নাত মিলবে বিষয়টি এতটা সহজ নয়। বোনদের হক পুরোপুরি বুঝিয়ে দেওয়া ইমানি দায়িত্ব। অথচ পুরো দেশে প্রায় প্রতিটি এলাকায়ই মেয়েদের ওপর এই বৈষম্য ও অত্যাচার চলে, তাদের ন্যায্য হক বুঝিয়ে দেওয়া হয় না।
উল্টো সমাজের কিছু মানুষ নিজের স্বার্থে বানানো হাদিস ছড়িয়ে দেয় যে, মেয়েরা বাপের বাড়ির সম্পদ নিলে নাকি তা তাদের ‘সইবে না’ বা অমঙ্গল হবে। একই বাপের সম্পদ ছেলে ভোগ করলে সমস্যা নেই, অথচ মেয়ে ভোগ করলেই সইবে না এর চেয়ে বড় জাহালতের কথা আর কী হতে পারে? আল্লাহ তাআলা আমাদের এই ভুল ও অন্যায় মানসিকতা পরিহার করার তৌফিক দান করুন।
যদি কেউ ওয়ারিশ বা বোনের পাওনা হক না দেন, তবে তিনি মারাত্মক গুনাহগার ও হারামখোর হবেন। অন্য কোনো জায়গা থেকে চুরি বা ডাকাতি করে টাকা আনলে যতটুকু গুনাহ হয়, বোনের হক মেরে খেলে গুনাহের পরিমাণ তার চেয়েও বেশি হতে পারে। কারণ, এখানে আপনি কেবল অন্যের হক নষ্ট করেননি, বরং নিজের রক্ত সম্পর্কীয় স্বজনের ওপর জুলুম করেছেন।
অপরিচিত কোনো মানুষের অধিকার নষ্ট করা যেমন গুনাহের কাজ, আত্মীয়-স্বজনের হক নষ্ট করাও গুনাহের কাজ। বরং আত্মীয়-স্বজনের হক নষ্ট করলে অপরাধের মাত্রা দ্বিগুণ হয়ে যায়। বোনদের পাওনা হক আত্মসাৎ করা ও তাদের ওপর জুলুম করা থেকে আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের সবাইকে বেঁচে থাকার তওফিক দান করেন।
ইসলাম ডেস্ক 
































