ঢাকা ০৮:২৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ০২ আগস্ট ২০২৬, ১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং

🌤️ বাংলাদেশের বিভাগসমূহের লাইভ আবহাওয়া

‘কলকাতা, ফিরলাম’- এই একটি বাক্য উচ্চারণ করতে লাগল ১৯ বছর!

শনিবার (১ আগস্ট) দীর্ঘ ১৯ বছর পর কলকাতায় ফিরে রবীন্দ্র সদনের মঞ্চে তসলিমা তাসরিন

ক্যালেন্ডারের পাতা ঘেঁষে কেটে গেছে দীর্ঘ ১৯টি বছর। সময়ের নিয়মে বদলেছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাস্তাঘাট, বদলেছে রাজনীতির রং ও ক্ষমতার অলিন্দ। কিন্তু বদলায়নি কেবল এক নির্বাসিত লেখিকার হাহাকার, কলকাতার বুক থেকে উপড়ে ফেলার রক্তক্ষরণ।

দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর সেই নির্বাসনের অন্ধকার পার করে অবশেষে কলকাতার মাটিতে পা রাখলেন বিতর্কিত ও বিশিষ্ট লেখিকা তসলিমা নাসরিন।

২০০৭ সালে নিজের বই ‘দ্বিখণ্ডিত’ ঘিরে সৃষ্ট উত্তাল পরিস্থিতির জেরে কলকাতা ছাড়তে বাধ্য হওয়ার পর, এতগুলো বছর পর শনিবার (১ আগস্ট) তার এই প্রত্যাবর্তনের মুহূর্ত ছিল গভীর আবেগ, অভিমান ও পরম স্বস্তির মেলবন্ধন। কলকাতার রবীন্দ্র সদনে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে শহরের বুকে পা রাখতেই অশ্রুসজল চোখে লেখিকা যেন খুঁজে পেলেন দীর্ঘদিনের হারিয়ে যাওয়া শিকড়।

মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তসলিমা স্পষ্ট জানান, ইউরোপের নানা দেশে নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তা পেলেও তা কখনো ‘আপনত্ব’-এর রূপ নিতে পারেনি। তিনি বলেন, “ইউরোপের সব কিছু ছেড়ে আমি এখানে এসেছিলাম প্রাণের টানে, বাংলা ভাষার টানে। আমি তো নিজের দেশে (বাংলাদেশে) ফেরা থেকে বঞ্চিত; আমার সেই দেশে না ফেরার কষ্টটা অনেকটাই লাঘব হয় যখন পশ্চিমবঙ্গে থাকি। মনে হয়, বাংলার এক পাশে তো ফিরেছি।”

নিজের এই দীর্ঘ অপেক্ষার দিনগুলোর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “কলকাতা, ফিরলাম- এই একটি বাক্য উচ্চারণ করতে আমার ১৯ বছর লেগেছে। নির্বাসিত মানুষের ক্যালেন্ডারে বছর শুধু সময় নয়, প্রতিটি বছর একটি বন্ধ দরজা, প্রতিটি দিন নিজের ঠিকানা হারানোর দুঃখ।” তার মতে, এই ফেরা কোনো শহরের উদ্দেশ্যে নয়, বরং তার হারিয়ে যাওয়া জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের কাছে ফিরে আসা।

২০০৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের বাম সরকারের আমলে গৃহবন্দি থাকা এবং পরবর্তীকালে শহরের নিরাপত্তার অজুহাতে তাকে জয়পুরে পাঠিয়ে একপ্রকার ‘তাড়িয়ে দেওয়ার’ নির্মম স্মৃতিও রোমন্থন করেন তিনি। তসলিমা অভিযোগ করেন, কোনো আদালত তাকে সাজা দেয়নি; বরং রাজনৈতিক স্বার্থ, ভোটব্যাংকের হিসাব ও ধর্মীয় তোষণের কাছে নতি স্বীকার করে তৎকালীন সরকার তাকে শহরছাড়া করেছিল। পরবর্তীতে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারও সেই একই ধারা বজায় রাখে।

তবে কেবল পশ্চিমবঙ্গের বিগত সরকারের ভূমিকা নয়, কলকাতার বুদ্ধিজীবী ও চেনা মানুষদের নীরবতাও তাকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল। তিনি আফসোস করে বলেন, বিপদের দিনে অনেকেই আড়ালে সমবেদনা জানালেও প্রকাশ্যে পাশে দাঁড়ানোর সাহস দেখাননি।

শনিবার কলকাতার ‘সেকুলার মিশন’- নামক একটি সংগঠনের উদ্যোগে এবং বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি সরকারের পূর্ণ নিরাপত্তা ও সম্মতির ভিত্তিতেই লেখিকার এই প্রত্যাবর্তন সম্ভব হয়। মঞ্চে উপস্থিত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তার নিরাপত্তার সব দায়িত্ব নেওয়ার আশ্বাস দিলে তসলিমা রাজ্য সরকারের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানান।

তবে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে তসলিমা ঘোষণা করেন, “আমি কোনো রাজনৈতিক দলের হয়ে কথা বলতে বা রাজনৈতিক অলংকার হতে আসিনি। আমার একমাত্র পক্ষ- স্বাধীনতা, সমানাধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা ও মানবতা।”

তার এই প্রত্যাবর্তনকে তিনি নিছক ব্যক্তিগত আনন্দ হিসেবে না দেখে, বাক-স্বাধীনতা, মুক্তচিন্তা এবং ভয়ের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে মানুষের ভালোবাসার জয় হিসেবে উল্লেখ করেন।

আগস্ট মাসে কলকাতায় ফেরাকে প্রত্যাবর্তনের মাস বলেও উল্লেখ করেন তসলিমা। তিনি বলেন, “আগস্ট আমার জন্মের মাস, আগস্ট আমার নির্বাসনের মাস, আজ থেকে আগস্ট আমার প্রত্যাবর্তনের মাসও। ১৯৯৪ সালের ৮ আগস্ট আমাকে বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিল তখনকার সরকার। রাতের অন্ধকারে স্বদেশের দরজা আমার জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তার পর একের পর এক সরকার এসেছে, কিন্তু ওই দরজা আর খোলেনি। আর মাত্র সাত দিন পর আমার নির্বাসনের ৩২ বছর পূর্ণ হবে। স্বদেশের বাইরে কাটানো সময় এরই মধ্যে স্বদেশে কাটানো সময়কে অতিক্রম করেছে। রাষ্ট্র আমাকে দেশ থেকে সরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আমার ভিতর থেকে দেশকে সরাতে পারেনি। বাংলা ভাষাই আমার বহনযোগ্য স্বদেশ, যে স্বদেশ আমি সঙ্গে করে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে নিয়ে বেরিয়েছি। এক বাংলায় (বাংলাদেশে) আমার জন্ম, আর এক বাংলায় (পশ্চিমবঙ্গে) হারিয়ে যাওয়া ঘর খুঁজে পেয়েছিলাম।”

তসলিমা আরো বলেন, “কলকাতা, এত বছর আমি তোমাকে প্রশ্ন করেছি, আমি তোমার কী ক্ষতি করেছিলাম? কেন আমাকে চলে যেতে হয়েছে? আজ উত্তর চাইতে আসিনি। বলতে এসেছি, আমি ফিরে এসেছি। আমার চোখে পানি, মনে অভিমান আছে, দুই হাত ভরা ভালোবাসাও আছে। যে শহর আমাকে কাঁদিয়েছে, সেই শহরই আমাকে স্বপ্ন দেখিয়েছে। যে শহর ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে, সেখানে ফেরার স্বপ্ন এতবছর দেখেছি। আমি জানি, চলে যাওয়া এবং ফিরে আসার মাঝের ১৯ বছর কেউ আমাকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না। কিন্তু আজকের এই দরজা খোলা প্রমাণ করে, অন্যায় দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, চিরস্থায়ী নয়।”

তিনি আরো বলেন, “কলকাতায় ফেরা শুধুমাত্র আমার ব্যক্তিগত আনন্দন নয়, এটি নির্বাসন ও নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে বাক স্বাধীনতা, মুক্ত চিন্তা এবং মানুষের ভালবাসার জয়। আমি যতদিন বেঁচে থাকব, পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকি, লিখব। যা সত্য বলে বিশ্বাস করি বলব। ১ আগস্ট, আজ একটি বন্ধ দরজা খোলার দিন। ইতিহাস যেমন মনে রাখে কারা দরজা বন্ধ করেছিল, তেমনই মনে রাখে, কারা দরজা খুলেছিল। কোনো মানচিত্র নয়, মানুষের ভালোবাসাই আসলে আমাদের দেশ।”

নিউজ বিজয় ২৪ডট কম/এফএইচএন
আপলোডকারির তথ্য

NewsBijoy24. Com

📰 নিউজবিজয়২৪.কম এমন একটি অনলাইন সংবাদপত্র, যার প্রতিটি শব্দে জড়িয়ে আছে সত্যের অঙ্গীকার ও মানবিকতার দায়বদ্ধতা। এই পত্রিকাটি উৎসর্গ করা হলো আমার পরম শ্রদ্ধেয় মা ও বাবার পবিত্র স্মৃতির উদ্দেশ্যে-যারা আজ এই পৃথিবীতে নেই, কিন্তু তাদের শিক্ষা, আদর্শ ও দোয়ার আলো আজও আমাদের পথ দেখায়। তাদের নিঃস্বার্থ ত্যাগ ও ভালোবাসার প্রেরণায় প্রতিষ্ঠিত এই সংবাদমাধ্যমের লক্ষ্য সত্য প্রকাশ, অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং মানুষের পাশে নির্ভীকভাবে দাঁড়ানো। হে আল্লাহ, আমার মা-বাবাকে জান্নাতুল ফেরদৌসে উচ্চ মাকাম দান করুন। আমিন। NewsBijoy24.Com 📰 সত্যের পথে, বিশ্বাসের সাথে।
জনপ্রিয় সংবাদ
⚽ ইউরোপ ইউরোপা লিগ, দ্বিতীয় বাছাইপর্বের পরিসংখ্যান ও লাইভ স্কোর

আসামির জন্য আনা পাউরুটির ভেতরে মিলল ইয়াবা ও গাঁজা

‘কলকাতা, ফিরলাম’- এই একটি বাক্য উচ্চারণ করতে লাগল ১৯ বছর!

আপডেট সময় ০৬:২৪:৪৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২ আগস্ট ২০২৬

ক্যালেন্ডারের পাতা ঘেঁষে কেটে গেছে দীর্ঘ ১৯টি বছর। সময়ের নিয়মে বদলেছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাস্তাঘাট, বদলেছে রাজনীতির রং ও ক্ষমতার অলিন্দ। কিন্তু বদলায়নি কেবল এক নির্বাসিত লেখিকার হাহাকার, কলকাতার বুক থেকে উপড়ে ফেলার রক্তক্ষরণ।

🔔 নিউজ বিজয়ের সর্বশেষ খবর পেতে টেলিগ্রাম চ্যানেল জয়েন করুন

দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর সেই নির্বাসনের অন্ধকার পার করে অবশেষে কলকাতার মাটিতে পা রাখলেন বিতর্কিত ও বিশিষ্ট লেখিকা তসলিমা নাসরিন।

২০০৭ সালে নিজের বই ‘দ্বিখণ্ডিত’ ঘিরে সৃষ্ট উত্তাল পরিস্থিতির জেরে কলকাতা ছাড়তে বাধ্য হওয়ার পর, এতগুলো বছর পর শনিবার (১ আগস্ট) তার এই প্রত্যাবর্তনের মুহূর্ত ছিল গভীর আবেগ, অভিমান ও পরম স্বস্তির মেলবন্ধন। কলকাতার রবীন্দ্র সদনে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে শহরের বুকে পা রাখতেই অশ্রুসজল চোখে লেখিকা যেন খুঁজে পেলেন দীর্ঘদিনের হারিয়ে যাওয়া শিকড়।

মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তসলিমা স্পষ্ট জানান, ইউরোপের নানা দেশে নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তা পেলেও তা কখনো ‘আপনত্ব’-এর রূপ নিতে পারেনি। তিনি বলেন, “ইউরোপের সব কিছু ছেড়ে আমি এখানে এসেছিলাম প্রাণের টানে, বাংলা ভাষার টানে। আমি তো নিজের দেশে (বাংলাদেশে) ফেরা থেকে বঞ্চিত; আমার সেই দেশে না ফেরার কষ্টটা অনেকটাই লাঘব হয় যখন পশ্চিমবঙ্গে থাকি। মনে হয়, বাংলার এক পাশে তো ফিরেছি।”

নিজের এই দীর্ঘ অপেক্ষার দিনগুলোর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “কলকাতা, ফিরলাম- এই একটি বাক্য উচ্চারণ করতে আমার ১৯ বছর লেগেছে। নির্বাসিত মানুষের ক্যালেন্ডারে বছর শুধু সময় নয়, প্রতিটি বছর একটি বন্ধ দরজা, প্রতিটি দিন নিজের ঠিকানা হারানোর দুঃখ।” তার মতে, এই ফেরা কোনো শহরের উদ্দেশ্যে নয়, বরং তার হারিয়ে যাওয়া জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের কাছে ফিরে আসা।

২০০৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের বাম সরকারের আমলে গৃহবন্দি থাকা এবং পরবর্তীকালে শহরের নিরাপত্তার অজুহাতে তাকে জয়পুরে পাঠিয়ে একপ্রকার ‘তাড়িয়ে দেওয়ার’ নির্মম স্মৃতিও রোমন্থন করেন তিনি। তসলিমা অভিযোগ করেন, কোনো আদালত তাকে সাজা দেয়নি; বরং রাজনৈতিক স্বার্থ, ভোটব্যাংকের হিসাব ও ধর্মীয় তোষণের কাছে নতি স্বীকার করে তৎকালীন সরকার তাকে শহরছাড়া করেছিল। পরবর্তীতে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারও সেই একই ধারা বজায় রাখে।

তবে কেবল পশ্চিমবঙ্গের বিগত সরকারের ভূমিকা নয়, কলকাতার বুদ্ধিজীবী ও চেনা মানুষদের নীরবতাও তাকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল। তিনি আফসোস করে বলেন, বিপদের দিনে অনেকেই আড়ালে সমবেদনা জানালেও প্রকাশ্যে পাশে দাঁড়ানোর সাহস দেখাননি।

শনিবার কলকাতার ‘সেকুলার মিশন’- নামক একটি সংগঠনের উদ্যোগে এবং বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি সরকারের পূর্ণ নিরাপত্তা ও সম্মতির ভিত্তিতেই লেখিকার এই প্রত্যাবর্তন সম্ভব হয়। মঞ্চে উপস্থিত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তার নিরাপত্তার সব দায়িত্ব নেওয়ার আশ্বাস দিলে তসলিমা রাজ্য সরকারের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানান।

তবে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে তসলিমা ঘোষণা করেন, “আমি কোনো রাজনৈতিক দলের হয়ে কথা বলতে বা রাজনৈতিক অলংকার হতে আসিনি। আমার একমাত্র পক্ষ- স্বাধীনতা, সমানাধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা ও মানবতা।”

তার এই প্রত্যাবর্তনকে তিনি নিছক ব্যক্তিগত আনন্দ হিসেবে না দেখে, বাক-স্বাধীনতা, মুক্তচিন্তা এবং ভয়ের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে মানুষের ভালোবাসার জয় হিসেবে উল্লেখ করেন।

আগস্ট মাসে কলকাতায় ফেরাকে প্রত্যাবর্তনের মাস বলেও উল্লেখ করেন তসলিমা। তিনি বলেন, “আগস্ট আমার জন্মের মাস, আগস্ট আমার নির্বাসনের মাস, আজ থেকে আগস্ট আমার প্রত্যাবর্তনের মাসও। ১৯৯৪ সালের ৮ আগস্ট আমাকে বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিল তখনকার সরকার। রাতের অন্ধকারে স্বদেশের দরজা আমার জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তার পর একের পর এক সরকার এসেছে, কিন্তু ওই দরজা আর খোলেনি। আর মাত্র সাত দিন পর আমার নির্বাসনের ৩২ বছর পূর্ণ হবে। স্বদেশের বাইরে কাটানো সময় এরই মধ্যে স্বদেশে কাটানো সময়কে অতিক্রম করেছে। রাষ্ট্র আমাকে দেশ থেকে সরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আমার ভিতর থেকে দেশকে সরাতে পারেনি। বাংলা ভাষাই আমার বহনযোগ্য স্বদেশ, যে স্বদেশ আমি সঙ্গে করে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে নিয়ে বেরিয়েছি। এক বাংলায় (বাংলাদেশে) আমার জন্ম, আর এক বাংলায় (পশ্চিমবঙ্গে) হারিয়ে যাওয়া ঘর খুঁজে পেয়েছিলাম।”

তসলিমা আরো বলেন, “কলকাতা, এত বছর আমি তোমাকে প্রশ্ন করেছি, আমি তোমার কী ক্ষতি করেছিলাম? কেন আমাকে চলে যেতে হয়েছে? আজ উত্তর চাইতে আসিনি। বলতে এসেছি, আমি ফিরে এসেছি। আমার চোখে পানি, মনে অভিমান আছে, দুই হাত ভরা ভালোবাসাও আছে। যে শহর আমাকে কাঁদিয়েছে, সেই শহরই আমাকে স্বপ্ন দেখিয়েছে। যে শহর ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে, সেখানে ফেরার স্বপ্ন এতবছর দেখেছি। আমি জানি, চলে যাওয়া এবং ফিরে আসার মাঝের ১৯ বছর কেউ আমাকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না। কিন্তু আজকের এই দরজা খোলা প্রমাণ করে, অন্যায় দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, চিরস্থায়ী নয়।”

তিনি আরো বলেন, “কলকাতায় ফেরা শুধুমাত্র আমার ব্যক্তিগত আনন্দন নয়, এটি নির্বাসন ও নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে বাক স্বাধীনতা, মুক্ত চিন্তা এবং মানুষের ভালবাসার জয়। আমি যতদিন বেঁচে থাকব, পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকি, লিখব। যা সত্য বলে বিশ্বাস করি বলব। ১ আগস্ট, আজ একটি বন্ধ দরজা খোলার দিন। ইতিহাস যেমন মনে রাখে কারা দরজা বন্ধ করেছিল, তেমনই মনে রাখে, কারা দরজা খুলেছিল। কোনো মানচিত্র নয়, মানুষের ভালোবাসাই আসলে আমাদের দেশ।”