ঢাকা ১২:৫৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং
হোম

🌤️ বাংলাদেশের বিভাগসমূহের লাইভ আবহাওয়া

ভারতে মসজিদের খুতবা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ মোদী সরকারের

ভারতশাসিত কাশ্মীরে ওয়াকফ বোর্ডের পক্ষ থেকে অঞ্চলটির সব মসজিদে জুমায় অভিন্ন খুতবা প্রবর্তনের একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ পদক্ষেপটি রাজনীতিক ও ধর্মীয় নেতাদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। তাদের অভিযোগ, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার মুসলিম ধর্মীয় স্থানগুলোর ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।

জম্মু-কাশ্মীর ওয়াক্‌ফ বোর্ডের প্রধান দারাক্ষণ আন্দ্রাবি। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় নেতা। গত সপ্তাহে ওয়াক্‌ফ বোর্ড মসজিদগুলোতে অভিন্ন জুমার খুতবা চালুর প্রস্তাব ঘোষণা করে। এরপরই এ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়।

কাশ্মীরের শীর্ষ মুসলিম ধর্মীয় পণ্ডিতেরা এ প্রস্তাবকে মুসলমানদের ধর্মীয় বিষয়ে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন হস্তক্ষেপ’ বলে সমালোচনা করেন।
অন্যদিকে, প্রস্তাবের পক্ষে যুক্তি দিয়ে আন্দ্রাবি ভারতের একটি শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রকে বলেন, ওয়াক্‌ফ বোর্ডের অধীনে একটি কমিটি অভিন্ন খুতবার বিষয়বস্তু নির্ধারণ করবে। মাদকাসক্তিসহ অঞ্চলের বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা মোকাবিলায় এ উদ্যোগ প্রয়োজন বলে তিনি দাবি করেন।

আন্দ্রাবি আরও বলেন, জুমার খুতবার বিষয়বস্তু ধর্মীয় পণ্ডিতেরা অনুমোদন করবেন। এতে কোনো সরকারি কর্মকর্তার ভূমিকা থাকবে না।

‘আমাদের উদ্বেগ উপেক্ষা করা হয়েছে’

গত রোববার কাশ্মীর অঞ্চলের প্রায় দেড় হাজার শীর্ষ ধর্মীয় পণ্ডিত ও খতিবকে বৈঠকে ডাকে ওয়াক্‌ফ বোর্ড। তাদের কেউ সরাসরি উপস্থিত হন, আবার প্রত্যন্ত এলাকার অনেকে অনলাইনে বৈঠকে যোগ দেন।

রাজৌরি জেলার এক ধর্মীয় নেতা জানান, অনলাইনে বৈঠকে অংশ নিয়ে তিনি জানতে পারেন, জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় নেতাদের নিয়ে গঠিত একটি কমিটির তৈরি ও পূর্বানুমোদিত খুতবাই শুক্রবার মসজিদগুলোতে অভিন্নভাবে পাঠ করতে হবে। তবে ওই কমিটিতে কারা থাকবেন, তা তাদের জানানো হয়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই ধর্মীয় নেতা বলেন, আমরা আপত্তি জানিয়ে বলেছিলাম, খুতবায় ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থি কিছু থাকলে আমরা নির্দেশনা মানবো না। কিন্তু তিনি আমাদের উদ্বেগ উপেক্ষা করেন এবং কথা বলতে দেননি।

আন্দ্রাবি তাদের বলেছেন, এ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত এবং চার বছর ধরে এটি নিয়ে কাজ চলছে।

‘ধর্মীয় স্বাধীনতা খর্বের চেষ্টা’

নতুন ব্যবস্থায় ওয়াক্‌ফসহ স্থানীয় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় কেন্দ্রীয় প্রশাসনের ক্ষমতা বেড়েছে। এরপর থেকে কাশ্মীরের স্থানীয় নেতারা একাধিকবার ওয়াক্‌ফ বোর্ডের বিরুদ্ধে ধর্মীয় স্বাধীনতা খর্ব করা এবং দীর্ঘদিনের ধর্মীয় রীতিনীতিতে হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলেছেন।

কাশ্মীরের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ রাজনীতিক নাঈম আখতার বলেন, যতক্ষণ শ্রোতা আছেন, ততক্ষণ প্রত্যেক ধর্মীয় বক্তার নিজের পছন্দের বিষয়ে কথা বলার স্বাধীনতা রয়েছে। আইনের মৌলিক ভিত্তিতেই এ স্বাধীনতা স্বীকৃত।

আখতারের মতে, বিজেপির সঙ্গে যুক্ত একজন পদাধিকারীর কাছ থেকে এ নির্দেশনা আসায় বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। ওয়াক্‌ফ বোর্ডের কাজ মূলত ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত। ধর্মীয় নেতারা কীভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করবেন, তা নির্ধারণের চেষ্টা করে বোর্ড নিজস্ব এখতিয়ার ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, ভারতের কোনো মুসলিম রাজনৈতিক দল কি কখনো কোনো হিন্দু পুরোহিতকে পূজা পরিচালনার পদ্ধতি কিংবা খ্রিষ্টান যাজককে রোববারের ধর্মোপদেশের বিষয়বস্তু নির্ধারণ করে দিতে পারে?

মঙ্গলবার কাশ্মীরের শীর্ষ মুসলিম ধর্মীয় নেতা মিরওয়াইজ উমর ফারুক সতর্ক করে বলেন, এমন উদ্যোগ হবে ধর্মীয় বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ।

তীব্র সমালোচনার মুখে ওয়াক্‌ফ বোর্ডের প্রধান আন্দ্রাবি তার আগের বক্তব্য থেকে সরে আসেন। পরে তিনি বলেন, মাদকাসক্তি, আত্মহত্যার প্রবণতা, মানসিক সংকটসহ বিভিন্ন সামাজিক বিষয় নিয়ে কথা বলার সিদ্ধান্ত স্বাধীন ধর্মীয় পণ্ডিত, প্রচারক ও খতিবদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ

কাশ্মীরের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অভিযোগ বিজেপি নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের বিরুদ্ধে এবারই প্রথম উঠল না।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে কাশ্মীরের মুসলিম ধর্মীয় পণ্ডিতেরা পুলিশের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগ তোলেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশ অঞ্চলটির বিভিন্ন মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খতিবদের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের জন্য ‘মসজিদের পরিচিতি নির্ধারণ’ শিরোনামে চার পৃষ্ঠার একটি ফরম বিতরণ করে। এতে তাদের বায়োমেট্রিক তথ্যসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত তথ্য চাওয়া হয়।

বহু বছর ধরেই কাশ্মীরের মুসলিমদের নামাজ ও ধর্মীয় কার্যক্রমে বিভিন্ন বিধিনিষেধের মুখে পড়তে হয়েছে। শ্রীনগরের প্রায় ৬০০ বছরের পুরোনো জামিয়া মসজিদেও ঈদের নামাজ ও পবিত্র রমজান মাসের লাইলাতুল কদরের মতো গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় অনুষ্ঠানে প্রায়ই বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

প্রশাসনের দাবি, শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতেই এসব বিধিনিষেধ দেওয়া হয়। তবে ধর্মীয় নেতাদের অভিযোগ, এ ধরনের পদক্ষেপ কাশ্মীরি মুসলমানদের ধর্মীয় পরিচয়, মর্যাদা ও মৌলিক অধিকারের ওপর ধারাবাহিক আঘাত।

মিরওয়াইজ উমর ফারুক নিজেও প্রায়ই চলাচলের ওপর বিধিনিষেধের মুখে পড়েন। এর ফলে গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের মতো বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার কথা থাকলেও কোনো কোনো শুক্রবার তিনি খুতবা দিতে পারেননি।

এর আগে ওয়াক্‌ফ বোর্ড অঞ্চলটির বড় মাজারগুলোর চত্বরে হলুদ চাল বিতরণের দীর্ঘদিনের প্রথা বন্ধ করার উদ্যোগও নিয়েছিল। কাশ্মীরে ইসলাম প্রচারে ভূমিকা রাখা সুফি ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ঐতিহ্যগতভাবে এ প্রথার সম্পর্ক রয়েছে।

২০২২ সালে বোর্ড ভক্তদের দেওয়া স্বেচ্ছামূলক নজর-ও-নিয়াজের অনুদান সংগ্রহের প্রচলিত প্রথাও নিষিদ্ধ করে। আধ্যাত্মিক গুরু, মাজারের খাদেম ও পরিচর্যাকারীদের দেওয়া এসব অনুদান সংগ্রহের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় কেন্দ্রীয় আইন কার্যকর হওয়ার যুক্তি দেখায় বোর্ড। এরপর সব অনুদান বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে নিতে নতুন দানবাক্স স্থাপন করা হয়।

কাশ্মীরে ধর্ম ও রাজনীতি

কাশ্মীরের অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ ও ইতিহাসবিদ নূর আহমদ বাবা বলেন, অঞ্চলটিতে রাজনৈতিক জনসমর্থন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ধর্ম সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাই প্রচলিত ধর্মীয় ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা বা তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা রাজনৈতিক ক্ষোভ তৈরি করে।

বিজেপিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং মুসলমানদের বিষয়ে তাদের রাজনীতির ধরনই পুরো উদ্যোগটিকে সন্দেহজনক করে তুলেছে।

তবে তার মতে, ধর্মীয় নেতাদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা থাকলে তাদের পক্ষ থেকে অভিন্ন খুতবার উদ্যোগ এলে তা হয়তো এতটা বিতর্ক তৈরি করত না। মাদকাসক্তি, দেরিতে বিয়ে, জলবায়ু পরিবর্তন ও সামাজিক সম্প্রীতির মতো বিষয় নিয়ে ধর্মীয় নেতাদের কথা বলার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না।

কাশ্মীরের সংঘাত নিয়ে চার দশক ধরে লেখালেখি করা শ্রীনগরভিত্তিক এক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, ভারতে হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদের উত্থানের মধ্যে কাশ্মীরে বিক্ষোভের সম্ভাবনা আগেভাগে নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা হিসেবে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে দেখা যেতে পারে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, উত্তর প্রদেশের উজ্জয়িনী ও সাহারানপুরের মতো শহরে সাম্প্রতিক সময়ে মসজিদ ভাঙার ঘটনাগুলো ভারতের শাসনব্যবস্থার ভেতরে কট্টর ডানপন্থি প্রবণতার পুনরুত্থান দেখিয়েছে বলে তার ধারণা। মোদী সরকারের নতুন করে সাম্প্রদায়িক অবস্থান নেওয়ার প্রবণতা কাশ্মীরের মতো অঞ্চলে প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

ওই বিশ্লেষকের মতে, মসজিদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে এই বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের মধ্যেই দেখতে হবে।

সূত্র: আল-জাজিরা

নিউজ বিজয় ২৪ডট কম/এফএইচএন
আপলোডকারির তথ্য

NewsBijoy24. Com

📰 নিউজবিজয়২৪.কম এমন একটি অনলাইন সংবাদপত্র, যার প্রতিটি শব্দে জড়িয়ে আছে সত্যের অঙ্গীকার ও মানবিকতার দায়বদ্ধতা। এই পত্রিকাটি উৎসর্গ করা হলো আমার পরম শ্রদ্ধেয় মা ও বাবার পবিত্র স্মৃতির উদ্দেশ্যে-যারা আজ এই পৃথিবীতে নেই, কিন্তু তাদের শিক্ষা, আদর্শ ও দোয়ার আলো আজও আমাদের পথ দেখায়। তাদের নিঃস্বার্থ ত্যাগ ও ভালোবাসার প্রেরণায় প্রতিষ্ঠিত এই সংবাদমাধ্যমের লক্ষ্য সত্য প্রকাশ, অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং মানুষের পাশে নির্ভীকভাবে দাঁড়ানো। হে আল্লাহ, আমার মা-বাবাকে জান্নাতুল ফেরদৌসে উচ্চ মাকাম দান করুন। আমিন। NewsBijoy24.Com 📰 সত্যের পথে, বিশ্বাসের সাথে।
জনপ্রিয় সংবাদ
⚽ আজকের সেরা ম্যাচগুলো ও লাইভ স্কোর

ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার: প্রধানমন্ত্রী

ভারতে মসজিদের খুতবা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ মোদী সরকারের

আপডেট সময় ১২:১৪:৩২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬

ভারতশাসিত কাশ্মীরে ওয়াকফ বোর্ডের পক্ষ থেকে অঞ্চলটির সব মসজিদে জুমায় অভিন্ন খুতবা প্রবর্তনের একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ পদক্ষেপটি রাজনীতিক ও ধর্মীয় নেতাদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। তাদের অভিযোগ, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার মুসলিম ধর্মীয় স্থানগুলোর ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।

🔔 নিউজ বিজয়ের সর্বশেষ খবর পেতে টেলিগ্রাম চ্যানেল জয়েন করুন

জম্মু-কাশ্মীর ওয়াক্‌ফ বোর্ডের প্রধান দারাক্ষণ আন্দ্রাবি। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় নেতা। গত সপ্তাহে ওয়াক্‌ফ বোর্ড মসজিদগুলোতে অভিন্ন জুমার খুতবা চালুর প্রস্তাব ঘোষণা করে। এরপরই এ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়।

কাশ্মীরের শীর্ষ মুসলিম ধর্মীয় পণ্ডিতেরা এ প্রস্তাবকে মুসলমানদের ধর্মীয় বিষয়ে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন হস্তক্ষেপ’ বলে সমালোচনা করেন।
অন্যদিকে, প্রস্তাবের পক্ষে যুক্তি দিয়ে আন্দ্রাবি ভারতের একটি শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রকে বলেন, ওয়াক্‌ফ বোর্ডের অধীনে একটি কমিটি অভিন্ন খুতবার বিষয়বস্তু নির্ধারণ করবে। মাদকাসক্তিসহ অঞ্চলের বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা মোকাবিলায় এ উদ্যোগ প্রয়োজন বলে তিনি দাবি করেন।

আন্দ্রাবি আরও বলেন, জুমার খুতবার বিষয়বস্তু ধর্মীয় পণ্ডিতেরা অনুমোদন করবেন। এতে কোনো সরকারি কর্মকর্তার ভূমিকা থাকবে না।

‘আমাদের উদ্বেগ উপেক্ষা করা হয়েছে’

গত রোববার কাশ্মীর অঞ্চলের প্রায় দেড় হাজার শীর্ষ ধর্মীয় পণ্ডিত ও খতিবকে বৈঠকে ডাকে ওয়াক্‌ফ বোর্ড। তাদের কেউ সরাসরি উপস্থিত হন, আবার প্রত্যন্ত এলাকার অনেকে অনলাইনে বৈঠকে যোগ দেন।

রাজৌরি জেলার এক ধর্মীয় নেতা জানান, অনলাইনে বৈঠকে অংশ নিয়ে তিনি জানতে পারেন, জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় নেতাদের নিয়ে গঠিত একটি কমিটির তৈরি ও পূর্বানুমোদিত খুতবাই শুক্রবার মসজিদগুলোতে অভিন্নভাবে পাঠ করতে হবে। তবে ওই কমিটিতে কারা থাকবেন, তা তাদের জানানো হয়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই ধর্মীয় নেতা বলেন, আমরা আপত্তি জানিয়ে বলেছিলাম, খুতবায় ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থি কিছু থাকলে আমরা নির্দেশনা মানবো না। কিন্তু তিনি আমাদের উদ্বেগ উপেক্ষা করেন এবং কথা বলতে দেননি।

আন্দ্রাবি তাদের বলেছেন, এ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত এবং চার বছর ধরে এটি নিয়ে কাজ চলছে।

‘ধর্মীয় স্বাধীনতা খর্বের চেষ্টা’

নতুন ব্যবস্থায় ওয়াক্‌ফসহ স্থানীয় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় কেন্দ্রীয় প্রশাসনের ক্ষমতা বেড়েছে। এরপর থেকে কাশ্মীরের স্থানীয় নেতারা একাধিকবার ওয়াক্‌ফ বোর্ডের বিরুদ্ধে ধর্মীয় স্বাধীনতা খর্ব করা এবং দীর্ঘদিনের ধর্মীয় রীতিনীতিতে হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলেছেন।

কাশ্মীরের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ রাজনীতিক নাঈম আখতার বলেন, যতক্ষণ শ্রোতা আছেন, ততক্ষণ প্রত্যেক ধর্মীয় বক্তার নিজের পছন্দের বিষয়ে কথা বলার স্বাধীনতা রয়েছে। আইনের মৌলিক ভিত্তিতেই এ স্বাধীনতা স্বীকৃত।

আখতারের মতে, বিজেপির সঙ্গে যুক্ত একজন পদাধিকারীর কাছ থেকে এ নির্দেশনা আসায় বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। ওয়াক্‌ফ বোর্ডের কাজ মূলত ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত। ধর্মীয় নেতারা কীভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করবেন, তা নির্ধারণের চেষ্টা করে বোর্ড নিজস্ব এখতিয়ার ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, ভারতের কোনো মুসলিম রাজনৈতিক দল কি কখনো কোনো হিন্দু পুরোহিতকে পূজা পরিচালনার পদ্ধতি কিংবা খ্রিষ্টান যাজককে রোববারের ধর্মোপদেশের বিষয়বস্তু নির্ধারণ করে দিতে পারে?

মঙ্গলবার কাশ্মীরের শীর্ষ মুসলিম ধর্মীয় নেতা মিরওয়াইজ উমর ফারুক সতর্ক করে বলেন, এমন উদ্যোগ হবে ধর্মীয় বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ।

তীব্র সমালোচনার মুখে ওয়াক্‌ফ বোর্ডের প্রধান আন্দ্রাবি তার আগের বক্তব্য থেকে সরে আসেন। পরে তিনি বলেন, মাদকাসক্তি, আত্মহত্যার প্রবণতা, মানসিক সংকটসহ বিভিন্ন সামাজিক বিষয় নিয়ে কথা বলার সিদ্ধান্ত স্বাধীন ধর্মীয় পণ্ডিত, প্রচারক ও খতিবদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ

কাশ্মীরের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অভিযোগ বিজেপি নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের বিরুদ্ধে এবারই প্রথম উঠল না।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে কাশ্মীরের মুসলিম ধর্মীয় পণ্ডিতেরা পুলিশের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগ তোলেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশ অঞ্চলটির বিভিন্ন মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খতিবদের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের জন্য ‘মসজিদের পরিচিতি নির্ধারণ’ শিরোনামে চার পৃষ্ঠার একটি ফরম বিতরণ করে। এতে তাদের বায়োমেট্রিক তথ্যসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত তথ্য চাওয়া হয়।

বহু বছর ধরেই কাশ্মীরের মুসলিমদের নামাজ ও ধর্মীয় কার্যক্রমে বিভিন্ন বিধিনিষেধের মুখে পড়তে হয়েছে। শ্রীনগরের প্রায় ৬০০ বছরের পুরোনো জামিয়া মসজিদেও ঈদের নামাজ ও পবিত্র রমজান মাসের লাইলাতুল কদরের মতো গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় অনুষ্ঠানে প্রায়ই বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

প্রশাসনের দাবি, শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতেই এসব বিধিনিষেধ দেওয়া হয়। তবে ধর্মীয় নেতাদের অভিযোগ, এ ধরনের পদক্ষেপ কাশ্মীরি মুসলমানদের ধর্মীয় পরিচয়, মর্যাদা ও মৌলিক অধিকারের ওপর ধারাবাহিক আঘাত।

মিরওয়াইজ উমর ফারুক নিজেও প্রায়ই চলাচলের ওপর বিধিনিষেধের মুখে পড়েন। এর ফলে গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের মতো বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার কথা থাকলেও কোনো কোনো শুক্রবার তিনি খুতবা দিতে পারেননি।

এর আগে ওয়াক্‌ফ বোর্ড অঞ্চলটির বড় মাজারগুলোর চত্বরে হলুদ চাল বিতরণের দীর্ঘদিনের প্রথা বন্ধ করার উদ্যোগও নিয়েছিল। কাশ্মীরে ইসলাম প্রচারে ভূমিকা রাখা সুফি ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ঐতিহ্যগতভাবে এ প্রথার সম্পর্ক রয়েছে।

২০২২ সালে বোর্ড ভক্তদের দেওয়া স্বেচ্ছামূলক নজর-ও-নিয়াজের অনুদান সংগ্রহের প্রচলিত প্রথাও নিষিদ্ধ করে। আধ্যাত্মিক গুরু, মাজারের খাদেম ও পরিচর্যাকারীদের দেওয়া এসব অনুদান সংগ্রহের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় কেন্দ্রীয় আইন কার্যকর হওয়ার যুক্তি দেখায় বোর্ড। এরপর সব অনুদান বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে নিতে নতুন দানবাক্স স্থাপন করা হয়।

কাশ্মীরে ধর্ম ও রাজনীতি

কাশ্মীরের অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ ও ইতিহাসবিদ নূর আহমদ বাবা বলেন, অঞ্চলটিতে রাজনৈতিক জনসমর্থন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ধর্ম সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাই প্রচলিত ধর্মীয় ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা বা তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা রাজনৈতিক ক্ষোভ তৈরি করে।

বিজেপিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং মুসলমানদের বিষয়ে তাদের রাজনীতির ধরনই পুরো উদ্যোগটিকে সন্দেহজনক করে তুলেছে।

তবে তার মতে, ধর্মীয় নেতাদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা থাকলে তাদের পক্ষ থেকে অভিন্ন খুতবার উদ্যোগ এলে তা হয়তো এতটা বিতর্ক তৈরি করত না। মাদকাসক্তি, দেরিতে বিয়ে, জলবায়ু পরিবর্তন ও সামাজিক সম্প্রীতির মতো বিষয় নিয়ে ধর্মীয় নেতাদের কথা বলার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না।

কাশ্মীরের সংঘাত নিয়ে চার দশক ধরে লেখালেখি করা শ্রীনগরভিত্তিক এক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, ভারতে হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদের উত্থানের মধ্যে কাশ্মীরে বিক্ষোভের সম্ভাবনা আগেভাগে নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা হিসেবে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে দেখা যেতে পারে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, উত্তর প্রদেশের উজ্জয়িনী ও সাহারানপুরের মতো শহরে সাম্প্রতিক সময়ে মসজিদ ভাঙার ঘটনাগুলো ভারতের শাসনব্যবস্থার ভেতরে কট্টর ডানপন্থি প্রবণতার পুনরুত্থান দেখিয়েছে বলে তার ধারণা। মোদী সরকারের নতুন করে সাম্প্রদায়িক অবস্থান নেওয়ার প্রবণতা কাশ্মীরের মতো অঞ্চলে প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

ওই বিশ্লেষকের মতে, মসজিদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে এই বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের মধ্যেই দেখতে হবে।

সূত্র: আল-জাজিরা