কয়েক দিনের ব্যবধানে ঢাকার মতিঝিল, মিরপুর-১০ ও ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশন এবং সাভারের আশুলিয়ায় বোমাসদৃশ বস্তু ও শক্তিশালী বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে দুটি ঘটনায় প্রকৃত ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) উদ্ধার হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অন্যদিকে মিরপুর-১০ ও ফার্মগেটে পাওয়া সন্দেহজনক বস্তু পরীক্ষা করে কোনো বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি। তবে ধারাবাহিক এসব ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছে-এগুলো কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি বিশেষ উদ্দেশ্যে মহলবিশেষ পরিকল্পিতভাবে জনমনে আতঙ্ক ছড়ানোর অপচেষ্টা করছে। এদিকে গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশের মাঠপর্যায়ের সব ইউনিটকে তাৎক্ষণিক নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শনিবার পুলিশ সদর দপ্তরের অপারেশন্স কন্ট্রোল থেকে পাঠানো জরুরি বার্তায় সারা দেশে এ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক যুগান্তরকে বলেন, মতিঝিল ও আশুলিয়ার বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় এখনো কাউকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তবে সিটিটিসিসহ পুলিশের একাধিক টিম তদন্ত করছে এবং জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে। তিনি বলেন, গ্রেফতারের পরই তাদের উদ্দেশ্য, কারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত এবং কেন এ ধরনের নাশকতার চেষ্টা করা হয়েছে, তা স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে তিনি জানান, যে কোনো ধরনের নাশকতা মোকাবিলায় সিটিটিসি সর্বোচ্চ প্রস্তুত রয়েছে এবং উগ্রবাদী ও অন্যান্য সন্ত্রাসী সংগঠনের কার্যক্রম গোয়েন্দা নজরদারির আওতায় রাখা হয়েছে। এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বশীল অনেক কর্মকর্তা বলছেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। তাদের মতে, দুষ্কৃতিকারী চক্র জনমনে ভয় ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতেই এ ধরনের অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তবে যে কোনো ধরনের নাশকতা প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ।
গত ২৪ জুলাই মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে একটি পরিত্যক্ত ছাতার ভেতর থেকে ১ থেকে ১.৫ কেজি ওজনের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পাইপ বোমা উদ্ধার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বোম ডিসপোজাল ইউনিট। নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে সেটি নিষ্ক্রিয় করার সময় এক পথচারী আহত হন। এর ছয়দিন পর, ৩০ জুলাই রাতে সাভারের আশুলিয়ায় একটি মুদি দোকানে ট্রাভেল ব্যাগের ভেতর রাখা প্রেসার কুকারে তৈরি করা আইইডি বোমা উদ্ধার করা হয়। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সেটি টাইমারযুক্ত ছিল এবং নির্দিষ্ট সময়ে বিস্ফোরণের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল। দুটি ঘটনাই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
এরই মধ্যে শনিবার সকালে মিরপুর-১০ ও ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে বোমাসদৃশ বস্তু দেখতে পেয়ে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেন। পরে বোম ডিসপোজাল ইউনিট পরীক্ষা করে জানায়, মিরপুরে পাওয়া বস্তুটি ছিল পান-সুপারির কৌটা এবং ফার্মগেটে পাওয়া বস্তার মধ্যে ছিল পরিত্যক্ত আবর্জনা। পরে এক সংবাদ সম্মেলনে সিটিটিসি প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক জানান, দুটি ঘটনায় জননিরাপত্তার জন্য কোনো হুমকি ছিল না। তবে মতিঝিল ও আশুলিয়ার প্রকৃত বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আশুলিয়ায় উদ্ধার হওয়া আইইডির নির্মাণকৌশল, ব্যবহৃত বিস্ফোরক উপাদান, টাইমিং ডিভাইস এবং অন্যান্য আলামত পরীক্ষা করা হচ্ছে। পাশাপাশি সিসিটিভি ফুটেজ, প্রযুক্তিগত তথ্য ও সম্ভাব্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গতিবিধি বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সিটিটিসির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বর্তমানে দেশে এমন কিছু ব্যক্তি রয়েছে, যারা ঘরে বসেই আইইডি তৈরির সক্ষমতা অর্জন করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সাভার, কেরানীগঞ্জ ও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্তে এমন তথ্যও এসেছে যে, অভিযুক্তদের কেউ কেউ বিদেশে বিস্ফোরক তৈরির প্রশিক্ষণ নিয়েছিল।
সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানভিত্তিক তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি) ও লস্কর-ই-তৈয়বার (এলইটি) সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতারের ঘটনাও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর নজরে রয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের দাবি, এসব নেটওয়ার্ক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, এনক্রিপটেড অ্যাপ এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে সদস্য সংগ্রহ ও মতাদর্শ প্রচারের চেষ্টা করছে। ফলে প্রকাশ্য সংগঠনের পাশাপাশি ছোট ছোট গোপন নেটওয়ার্ক বা ‘স্লিপার সেল’ এখন নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক যুগান্তরকে বলেন, জঙ্গিবাদ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর। বড় ধরনের হামলা না হওয়াকে জঙ্গিবাদের অবসান হিসাবে দেখার সুযোগ নেই। অনলাইন প্রচারণা, গোপন যোগাযোগ এবং ক্ষুদ্র নেটওয়ার্ক তৈরির প্রবণতা নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। তার মতে, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান নয়, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং সমাজের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই উগ্রবাদ প্রতিরোধকে আরও কার্যকর করা সম্ভব।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, বর্তমানে বড় ধরনের হামলার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই, তবে সম্ভাব্য নাশকতা ঠেকাতে সব ধরনের গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এমজেডএম ইন্তেখাব চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, যে নামেই বা যে আদর্শের আড়ালেই উগ্রবাদ পরিচালিত হোক না কেন, তা মোকাবিলায় র্যাব কঠোর অবস্থানে রয়েছে। গোয়েন্দা নজরদারি ও সাইবার মনিটরিং সার্বক্ষণিক চালু রয়েছে এবং যে কোনো বিশ্বাসযোগ্য তথ্য যাচাই করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো একদিকে যেমন গুজব ও আতঙ্কের ঝুঁকি বাড়িয়েছে, অন্যদিকে প্রকৃত বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনাগুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্তের প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছে। তাদের মতে, দ্রুত তদন্ত শেষ করে দায়ীদের শনাক্ত করা, প্রযুক্তিনির্ভর গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করা এবং জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি-এই তিনটি পদক্ষেপই ভবিষ্যতে সম্ভাব্য নাশকতা প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
সারা দেশে পুলিশের সতর্কতা জারি : উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্য বা দুষ্কৃতকারীরা পুলিশের জিপ, পিকআপভ্যান, বাসসহ বিভিন্ন যানবাহনের ওপর হামলা চালাতে পারে। গোয়েন্দা সংস্থার এমন তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশের মাঠপর্যায়ের সব ইউনিটকে তাৎক্ষণিক নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শনিবার পুলিশ সদর দপ্তরের অপারেশন্স কন্ট্রোল থেকে পাঠানো জরুরি বার্তায় সারা দেশে এই সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, পুলিশের যানবাহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোনো ধরনের শিথিলতা বা অবহেলার সুযোগ নেই। বিশেষ করে ডিউটির সময় এবং ডিউটি শেষে পার্কিং করা যানবাহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নির্দেশনা বলা হয়, ডিউটিরত কোনো যানবাহন সাময়িকভাবে থামানোর প্রয়োজন হলে সেটি অবশ্যই নিরাপদ স্থানে পার্ক করতে হবে এবং পুলিশের সদস্যদের সার্বক্ষণিক নজরদারির আওতায় রাখতে হবে। কোনো অবস্থাতেই চালক বা দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য ছাড়া যানবাহন ফেলে রাখা যাবে না। এছাড়া ডিউটি শেষে থানা, পুলিশ লাইন্স, অফিস কম্পাউন্ড কিংবা অন্যান্য নির্ধারিত স্থানে রাখা সব সরকারি যানবাহনের নিরাপত্তাও বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব স্থানে নিয়মিত টহল, প্রয়োজনীয় নজরদারি এবং সন্দেহজনক ব্যক্তি বা বস্তু শনাক্তে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
অনলাইন ডেস্ক : 

























