ঢাকা ০২:৫৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং
হোম

🌤️ বাংলাদেশের বিভাগসমূহের লাইভ আবহাওয়া

পাইলসের সমস্যা লুকিয়ে নয়, চিকিৎসকের পরামর্শ নিন

পায়খানার সঙ্গে রক্ত যাচ্ছে? মলদ্বারের কাছে গুটি বা মাংসপিণ্ডের মতো কিছু অনুভূত হচ্ছে? পায়খানা করতে কষ্ট হচ্ছে? এ ধরনের সমস্যায় অনেকেই প্রথমে ভয় পান, পরে লজ্জায় কাউকে বলতে চান না। কেউ ফার্মেসি থেকে নিজের মতো করে ওষুধ কিনে খান, কেউ পরিচিতজনের পরামর্শ নেন, আবার কেউ ছুটে যান কবিরাজ বা কথিত ‘গ্যারান্টি চিকিৎসা’র কাছে। ফলে রোগের চিকিৎসা না হয়ে অনেক সময় সমস্যাটি আরও জটিল হয়।

পাইলস বা হেমোরয়েড খুবই সাধারণ একটি রোগ। এটি নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মলদ্বার দিয়ে রক্তপাত হলেই সেটিকে পাইলস ধরে নেওয়া যাবে না। কারণ, পাইলস ছাড়াও মলদ্বারের ফাটল (অ্যানাল ফিশার), পলিপ, অন্ত্রের বিভিন্ন রোগ এমনকি কোলোরেক্টাল ক্যানসারেও রক্তপাত হতে পারে।

পাইলস কী?

মলদ্বার ও পায়ুপথের ভেতরে স্বাভাবিকভাবেই কিছু রক্তনালির গুচ্ছ থাকে। এগুলো মলত্যাগের সময় পায়ুপথের নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। কোনো কারণে এসব রক্তনালি ফুলে গিয়ে উপসর্গ তৈরি করলে তাকে হেমোরয়েড বা প্রচলিত ভাষায় পাইলস বলা হয়।

এটি প্রধানত দুই ধরনের—ইন্টারনাল পাইলস এবং এক্সটারনাল পাইলস। ইন্টারনাল পাইলসের ক্ষেত্রে মলত্যাগের সময় উজ্জ্বল লাল রক্তপাত হতে পারে। রোগ বাড়লে পাইলসের অংশ মলত্যাগের সময় বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে। অন্যদিকে এক্সটারনাল হেমোরয়েডে গুটি ও ব্যথা বেশি হতে পারে, বিশেষ করে সেখানে রক্ত জমাট বাঁধলে।
আরও পড়ুন
প্রতি ৮টি ক্যানসারের ১টির পেছনে রয়েছে সংক্রমণ, যার অধিকাংশই প্রতিরোধযোগ্য
প্রতি ৮টি ক্যানসারের ১টির পেছনে রয়েছে সংক্রমণ, যার অধিকাংশই প্রতিরোধযোগ্য

কেন হয় পাইলস?

পাইলসের সঙ্গে কয়েকটি বিষয় সম্পর্কিত—

১. দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্য

২. মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেওয়া

৩. টয়লেটে দীর্ঘ সময় বসে থাকা

৪. খাবারে পর্যাপ্ত আঁশ না থাকা

৫. অতিরিক্ত ওজন

৬. গর্ভাবস্থা

৭. দীর্ঘদিনের ডায়রিয়া বা অনিয়মিত মলত্যাগ

তবে একটি প্রচলিত ধারণা হলো, ঝাল-মসলাযুক্ত খাবার খেলেই পাইলস হয়। এটি পুরোপুরি সঠিক নয়। ঝাল খাবার কারও কারও ক্ষেত্রে মলদ্বারের জ্বালাপোড়া বা অস্বস্তি বাড়াতে পারে, কিন্তু পাইলস হওয়ার একমাত্র কারণ এটি নয়।

মলদ্বার দিয়ে রক্ত পড়লেই কি পাইলস?

না, এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পাইলস একটি কারণ হতে পারে, কিন্তু একমাত্র কারণ নয়। বিশেষ করে বারবার রক্তপাত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে কারণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

পাইলস কি ক্যানসারে পরিণত হয়?

সাধারণ পাইলস ক্যানসারে পরিণত হয় না। তবে পাইলস ও কোলোরেক্টাল ক্যানসারের কিছু উপসর্গ একই রকম হতে পারে। তাই বয়স, উপসর্গ ও ঝুঁকির ওপর ভিত্তি করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।

পাইলস হলে কি অপারেশন করতেই হবে?

না, সব পাইলসের জন্য অপারেশন প্রয়োজন হয় না। রোগের মাত্রা ও উপসর্গ অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, কোষ্ঠকাঠিন্যের চিকিৎসা, ওষুধ, রাবার ব্যান্ড লিগেশনসহ বিভিন্ন চিকিৎসা দেওয়া যায়। উন্নত পর্যায়ের বা নির্দিষ্ট ধরনের পাইলসের ক্ষেত্রে অপারেশন প্রয়োজন হতে পারে।

অপারেশন কি খুব কষ্টকর?

আধুনিক চিকিৎসায় পাইলসের বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা ও অপারেশন রয়েছে। কোন পদ্ধতি উপযুক্ত হবে তা নির্ভর করে পাইলসের ধরন, মাত্রা ও রোগীর সামগ্রিক অবস্থার ওপর। তাই অন্য কারও অভিজ্ঞতা শুনে নিজের চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ধারণ করা ঠিক নয়।

কবিরাজি ওষুধে কি পাইলস ভালো হয়?

কোনো চিকিৎসা কার্যকর কি না তা নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার করা উচিত। পাইলসের নামে অজানা মিশ্রণের ওষুধ, মলম, পাউডার কিংবা মলদ্বারে কোনো ক্ষয়কারী বা অজ্ঞাত পদার্থ ব্যবহার করলে পোড়া, ক্ষত, সংক্রমণ ও অন্যান্য জটিলতা হতে পারে। সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো—এতে মূল রোগের সঠিক চিকিৎসা বিলম্বিত হতে পারে।

কবিরাজের কাছে গেলে সমস্যা কোথায়?

যে কোনো চিকিৎসা পদ্ধতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সঠিক রোগ নির্ণয়। মলদ্বার দিয়ে রক্তপাতের কারণ পাইলস না হয়ে অন্য কোনো রোগ হলে শুধু ‘পাইলসের চিকিৎসা’ করতে থাকলে মূল রোগটি ধরা পড়তে দেরি হতে পারে। তাই অপ্রমাণিত চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

পাইলস হলে কী খাব?

আঁশযুক্ত খাবার বাড়াতে হবে। যেমন— শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, গোটা শস্য ও অন্যান্য আঁশযুক্ত খাবার। পর্যাপ্ত পানি পান করাও গুরুত্বপূর্ণ। লক্ষ্য হলো মল নরম রাখা এবং কোষ্ঠকাঠিন্য এড়ানো।

টয়লেটে মোবাইল নিয়ে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা কি ক্ষতিকর?

টয়লেটে অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘ সময় বসে থাকা এবং মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেওয়া হেমোরয়েডের সমস্যা বাড়াতে পারে। তাই মলত্যাগের প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত সময় না নিয়ে স্বাভাবিকভাবে মলত্যাগের অভ্যাস করা ভালো।

পাইলস কি নিজে নিজে ভালো হয়ে যায়?

প্রাথমিক পর্যায়ের অনেক রোগীর উপসর্গ খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনে কমে যেতে পারে। কিন্তু বারবার রক্তপাত, বাইরে বেরিয়ে আসা গুটি বা দীর্ঘস্থায়ী উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন। উপসর্গ কমে গেছে মানেই রোগের কারণ নিশ্চিতভাবে চলে গেছে—এমন নয়।

কখন অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে?

নিচের যেকোনো সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন—

• বারবার মলদ্বার দিয়ে রক্তপাত

• বেশি পরিমাণে রক্তপাত

• মল কালো হয়ে যাওয়া

• মলত্যাগের অভ্যাসে নতুন পরিবর্তন

• অকারণে ওজন কমে যাওয়া

• অতিরিক্ত দুর্বলতা বা রক্তস্বল্পতার লক্ষণ

• মলদ্বারের কাছে নতুন গুটি বা অস্বাভাবিক অংশ

• দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্য

• তীব্র ব্যথা বা জ্বরের সঙ্গে মলদ্বারের সমস্যা

পাইলস প্রতিরোধে কী করবেন?

কিছু সহজ অভ্যাস পাইলসের সমস্যা কমাতে সাহায্য করতে পারে—

১. প্রতিদিন পর্যাপ্ত আঁশযুক্ত খাবার খান।

২. পর্যাপ্ত পানি পান করুন।

৩. কোষ্ঠকাঠিন্য হলে অবহেলা করবেন না।

৪. মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেবেন না।

৫. টয়লেটে অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘ সময় বসে থাকবেন না।

৬. নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম করুন।

৭. অতিরিক্ত ওজন থাকলে তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করুন।

৮. মলদ্বার দিয়ে রক্তপাত হলে নিজে নিজে দীর্ঘদিন চিকিৎসা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

শেষ কথা

পাইলস নিয়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা অনেক সময় রোগটি নয়, রোগ সম্পর্কে ভয়, লজ্জা, কুসংস্কার ও ভুল চিকিৎসা। মলদ্বারের রোগ নিয়ে কথা বলতে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। শরীরের অন্য যেকোনো অঙ্গের মতো এটিও একটি চিকিৎসাযোগ্য স্বাস্থ্য সমস্যা। কবিরাজি, ঝাড়ফুঁক, অজানা ওষুধ বা ‘একদিনে পাইলস ভালো’—এ ধরনের দাবির পেছনে না ছুটে সঠিক রোগ নির্ণয় ও বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা গ্রহণ করুন।

মনে রাখবেন— মলদ্বার দিয়ে রক্তপাতকে কখনোই অবহেলা করবেন না। পাইলস হতে পারে, কিন্তু নিশ্চিত না হয়ে পাইলস ধরে নেওয়া ঠিক নয়। ভয় নয়, লজ্জা নয়—সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

লেখক

ডা. মোহাম্মদ আশরাফ উদ্দীন খান

সহকারী অধ্যাপক, সার্জারী বিভাগ

আলোক হাসপাতাল, মিরপুর-৬

নিউজ বিজয় ২৪ডট কম/এফএইচএন
আপলোডকারির তথ্য

NewsBijoy24. Com

📰 নিউজবিজয়২৪.কম এমন একটি অনলাইন সংবাদপত্র, যার প্রতিটি শব্দে জড়িয়ে আছে সত্যের অঙ্গীকার ও মানবিকতার দায়বদ্ধতা। এই পত্রিকাটি উৎসর্গ করা হলো আমার পরম শ্রদ্ধেয় মা ও বাবার পবিত্র স্মৃতির উদ্দেশ্যে-যারা আজ এই পৃথিবীতে নেই, কিন্তু তাদের শিক্ষা, আদর্শ ও দোয়ার আলো আজও আমাদের পথ দেখায়। তাদের নিঃস্বার্থ ত্যাগ ও ভালোবাসার প্রেরণায় প্রতিষ্ঠিত এই সংবাদমাধ্যমের লক্ষ্য সত্য প্রকাশ, অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং মানুষের পাশে নির্ভীকভাবে দাঁড়ানো। হে আল্লাহ, আমার মা-বাবাকে জান্নাতুল ফেরদৌসে উচ্চ মাকাম দান করুন। আমিন। NewsBijoy24.Com 📰 সত্যের পথে, বিশ্বাসের সাথে।
জনপ্রিয় সংবাদ
⚽ আজকের সেরা ম্যাচগুলো ও লাইভ স্কোর

বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ

পাইলসের সমস্যা লুকিয়ে নয়, চিকিৎসকের পরামর্শ নিন

আপডেট সময় ০৬:৫৯:০৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬

পায়খানার সঙ্গে রক্ত যাচ্ছে? মলদ্বারের কাছে গুটি বা মাংসপিণ্ডের মতো কিছু অনুভূত হচ্ছে? পায়খানা করতে কষ্ট হচ্ছে? এ ধরনের সমস্যায় অনেকেই প্রথমে ভয় পান, পরে লজ্জায় কাউকে বলতে চান না। কেউ ফার্মেসি থেকে নিজের মতো করে ওষুধ কিনে খান, কেউ পরিচিতজনের পরামর্শ নেন, আবার কেউ ছুটে যান কবিরাজ বা কথিত ‘গ্যারান্টি চিকিৎসা’র কাছে। ফলে রোগের চিকিৎসা না হয়ে অনেক সময় সমস্যাটি আরও জটিল হয়।

🔔 নিউজ বিজয়ের সর্বশেষ খবর পেতে টেলিগ্রাম চ্যানেল জয়েন করুন

পাইলস বা হেমোরয়েড খুবই সাধারণ একটি রোগ। এটি নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মলদ্বার দিয়ে রক্তপাত হলেই সেটিকে পাইলস ধরে নেওয়া যাবে না। কারণ, পাইলস ছাড়াও মলদ্বারের ফাটল (অ্যানাল ফিশার), পলিপ, অন্ত্রের বিভিন্ন রোগ এমনকি কোলোরেক্টাল ক্যানসারেও রক্তপাত হতে পারে।

পাইলস কী?

মলদ্বার ও পায়ুপথের ভেতরে স্বাভাবিকভাবেই কিছু রক্তনালির গুচ্ছ থাকে। এগুলো মলত্যাগের সময় পায়ুপথের নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। কোনো কারণে এসব রক্তনালি ফুলে গিয়ে উপসর্গ তৈরি করলে তাকে হেমোরয়েড বা প্রচলিত ভাষায় পাইলস বলা হয়।

এটি প্রধানত দুই ধরনের—ইন্টারনাল পাইলস এবং এক্সটারনাল পাইলস। ইন্টারনাল পাইলসের ক্ষেত্রে মলত্যাগের সময় উজ্জ্বল লাল রক্তপাত হতে পারে। রোগ বাড়লে পাইলসের অংশ মলত্যাগের সময় বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে। অন্যদিকে এক্সটারনাল হেমোরয়েডে গুটি ও ব্যথা বেশি হতে পারে, বিশেষ করে সেখানে রক্ত জমাট বাঁধলে।
আরও পড়ুন
প্রতি ৮টি ক্যানসারের ১টির পেছনে রয়েছে সংক্রমণ, যার অধিকাংশই প্রতিরোধযোগ্য
প্রতি ৮টি ক্যানসারের ১টির পেছনে রয়েছে সংক্রমণ, যার অধিকাংশই প্রতিরোধযোগ্য

কেন হয় পাইলস?

পাইলসের সঙ্গে কয়েকটি বিষয় সম্পর্কিত—

১. দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্য

২. মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেওয়া

৩. টয়লেটে দীর্ঘ সময় বসে থাকা

৪. খাবারে পর্যাপ্ত আঁশ না থাকা

৫. অতিরিক্ত ওজন

৬. গর্ভাবস্থা

৭. দীর্ঘদিনের ডায়রিয়া বা অনিয়মিত মলত্যাগ

তবে একটি প্রচলিত ধারণা হলো, ঝাল-মসলাযুক্ত খাবার খেলেই পাইলস হয়। এটি পুরোপুরি সঠিক নয়। ঝাল খাবার কারও কারও ক্ষেত্রে মলদ্বারের জ্বালাপোড়া বা অস্বস্তি বাড়াতে পারে, কিন্তু পাইলস হওয়ার একমাত্র কারণ এটি নয়।

মলদ্বার দিয়ে রক্ত পড়লেই কি পাইলস?

না, এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পাইলস একটি কারণ হতে পারে, কিন্তু একমাত্র কারণ নয়। বিশেষ করে বারবার রক্তপাত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে কারণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

পাইলস কি ক্যানসারে পরিণত হয়?

সাধারণ পাইলস ক্যানসারে পরিণত হয় না। তবে পাইলস ও কোলোরেক্টাল ক্যানসারের কিছু উপসর্গ একই রকম হতে পারে। তাই বয়স, উপসর্গ ও ঝুঁকির ওপর ভিত্তি করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।

পাইলস হলে কি অপারেশন করতেই হবে?

না, সব পাইলসের জন্য অপারেশন প্রয়োজন হয় না। রোগের মাত্রা ও উপসর্গ অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, কোষ্ঠকাঠিন্যের চিকিৎসা, ওষুধ, রাবার ব্যান্ড লিগেশনসহ বিভিন্ন চিকিৎসা দেওয়া যায়। উন্নত পর্যায়ের বা নির্দিষ্ট ধরনের পাইলসের ক্ষেত্রে অপারেশন প্রয়োজন হতে পারে।

অপারেশন কি খুব কষ্টকর?

আধুনিক চিকিৎসায় পাইলসের বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা ও অপারেশন রয়েছে। কোন পদ্ধতি উপযুক্ত হবে তা নির্ভর করে পাইলসের ধরন, মাত্রা ও রোগীর সামগ্রিক অবস্থার ওপর। তাই অন্য কারও অভিজ্ঞতা শুনে নিজের চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ধারণ করা ঠিক নয়।

কবিরাজি ওষুধে কি পাইলস ভালো হয়?

কোনো চিকিৎসা কার্যকর কি না তা নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার করা উচিত। পাইলসের নামে অজানা মিশ্রণের ওষুধ, মলম, পাউডার কিংবা মলদ্বারে কোনো ক্ষয়কারী বা অজ্ঞাত পদার্থ ব্যবহার করলে পোড়া, ক্ষত, সংক্রমণ ও অন্যান্য জটিলতা হতে পারে। সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো—এতে মূল রোগের সঠিক চিকিৎসা বিলম্বিত হতে পারে।

কবিরাজের কাছে গেলে সমস্যা কোথায়?

যে কোনো চিকিৎসা পদ্ধতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সঠিক রোগ নির্ণয়। মলদ্বার দিয়ে রক্তপাতের কারণ পাইলস না হয়ে অন্য কোনো রোগ হলে শুধু ‘পাইলসের চিকিৎসা’ করতে থাকলে মূল রোগটি ধরা পড়তে দেরি হতে পারে। তাই অপ্রমাণিত চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

পাইলস হলে কী খাব?

আঁশযুক্ত খাবার বাড়াতে হবে। যেমন— শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, গোটা শস্য ও অন্যান্য আঁশযুক্ত খাবার। পর্যাপ্ত পানি পান করাও গুরুত্বপূর্ণ। লক্ষ্য হলো মল নরম রাখা এবং কোষ্ঠকাঠিন্য এড়ানো।

টয়লেটে মোবাইল নিয়ে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা কি ক্ষতিকর?

টয়লেটে অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘ সময় বসে থাকা এবং মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেওয়া হেমোরয়েডের সমস্যা বাড়াতে পারে। তাই মলত্যাগের প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত সময় না নিয়ে স্বাভাবিকভাবে মলত্যাগের অভ্যাস করা ভালো।

পাইলস কি নিজে নিজে ভালো হয়ে যায়?

প্রাথমিক পর্যায়ের অনেক রোগীর উপসর্গ খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনে কমে যেতে পারে। কিন্তু বারবার রক্তপাত, বাইরে বেরিয়ে আসা গুটি বা দীর্ঘস্থায়ী উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন। উপসর্গ কমে গেছে মানেই রোগের কারণ নিশ্চিতভাবে চলে গেছে—এমন নয়।

কখন অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে?

নিচের যেকোনো সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন—

• বারবার মলদ্বার দিয়ে রক্তপাত

• বেশি পরিমাণে রক্তপাত

• মল কালো হয়ে যাওয়া

• মলত্যাগের অভ্যাসে নতুন পরিবর্তন

• অকারণে ওজন কমে যাওয়া

• অতিরিক্ত দুর্বলতা বা রক্তস্বল্পতার লক্ষণ

• মলদ্বারের কাছে নতুন গুটি বা অস্বাভাবিক অংশ

• দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্য

• তীব্র ব্যথা বা জ্বরের সঙ্গে মলদ্বারের সমস্যা

পাইলস প্রতিরোধে কী করবেন?

কিছু সহজ অভ্যাস পাইলসের সমস্যা কমাতে সাহায্য করতে পারে—

১. প্রতিদিন পর্যাপ্ত আঁশযুক্ত খাবার খান।

২. পর্যাপ্ত পানি পান করুন।

৩. কোষ্ঠকাঠিন্য হলে অবহেলা করবেন না।

৪. মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেবেন না।

৫. টয়লেটে অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘ সময় বসে থাকবেন না।

৬. নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম করুন।

৭. অতিরিক্ত ওজন থাকলে তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করুন।

৮. মলদ্বার দিয়ে রক্তপাত হলে নিজে নিজে দীর্ঘদিন চিকিৎসা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

শেষ কথা

পাইলস নিয়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা অনেক সময় রোগটি নয়, রোগ সম্পর্কে ভয়, লজ্জা, কুসংস্কার ও ভুল চিকিৎসা। মলদ্বারের রোগ নিয়ে কথা বলতে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। শরীরের অন্য যেকোনো অঙ্গের মতো এটিও একটি চিকিৎসাযোগ্য স্বাস্থ্য সমস্যা। কবিরাজি, ঝাড়ফুঁক, অজানা ওষুধ বা ‘একদিনে পাইলস ভালো’—এ ধরনের দাবির পেছনে না ছুটে সঠিক রোগ নির্ণয় ও বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা গ্রহণ করুন।

মনে রাখবেন— মলদ্বার দিয়ে রক্তপাতকে কখনোই অবহেলা করবেন না। পাইলস হতে পারে, কিন্তু নিশ্চিত না হয়ে পাইলস ধরে নেওয়া ঠিক নয়। ভয় নয়, লজ্জা নয়—সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

লেখক

ডা. মোহাম্মদ আশরাফ উদ্দীন খান

সহকারী অধ্যাপক, সার্জারী বিভাগ

আলোক হাসপাতাল, মিরপুর-৬