লালমনিরহাট আদিতমারীতে কলেজ শিক্ষক আরিফুল ইমলামের পরিবারের পাশে দুর্যোগ ও ত্রাণমন্ত্রী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবীব দুলু। তিনি এই নৃশংসভাবে ভাবে হত্যাকারীদের দ্রুত বিচার ও তার স্ত্রীকে কর্মসংস্থানের আশ্বাস দিলেন। এ সময় তিনি নিহত আরিফুলের স্ত্রীর হাতে নগদ অর্থ সহায়তা করেন।
তিনি বুধবার (২৬ আগষ্ট) বিকেলে উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের গন্ধমরুয়া এলাকায় কলেজ আলোচিত শিক্ষক আরিফুল ইসলামের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। আরিফুল লালমনিরহাট সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক ছিলেন।
মন্ত্রী দুলু বলেন,আলোচিত নন্দিনী হত্যা মামলার মতো শিক্ষক আরিফুল ইসলাম হত্যা মামলার রায়ও দ্রুত সময়ের মধ্যে ঘোষণা করা হবে। শিক্ষক আরিফুল ইসলামের মৃত্যুতে তার পরিবার অসহায় হয়ে পড়েছে। তার দুটি সন্তান রয়েছে। এর মধ্যে ছোট সন্তানটি শেষ পর্যন্ত বাবাকে দেখতেও পারেনি। পরিবারের সদস্যদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়ে দুলু বলেন, যারা সামান্য ঘটনাকে বিশাল আকার তৈরি করছে, তারা সমাজের শত্রু, দেশের শত্রু। যারা এ ধরনের নৃশংসভাবে হত্যা করে তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। আমাদের সরকার কোনোভাবে কাউকে ছাড় দেবে না। তারা যেখানেই এবং যে অবস্থায় থাকুক, আইনের আওতায় আনা হবে। এতে যে গোষ্ঠীরই হোক, যে রাজনৈতিক মতাদর্শেরই হোক, যে প্রভাবশালী ব্যক্তিই হোক—তাকে গ্রেপ্তার করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী।
তিনি আরো বলেন, কিছুদিন আগে এই ছোট্ট আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল—ছোট্ট একটি মেয়ে, নন্দিনী তাকেও নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। ছয় কার্যদিবসে এই বিচারকার্য সম্পন্ন করে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হয়েছে। অল্প সময়ের ভেতরে এই তদন্ত কাজ শেষ করে দ্রুত সময়ের মধ্যে চার্জশিট প্রদান করা হবে এবং চার্জশিট প্রদানের মাধ্যমে, বিচারকার্যের মাধ্যমে তাদেরও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হবে।
পরিবারদের উদ্দেশ্যে তিনি আরো বলেন, দুটি ছোট বাচ্চা সবচেয়ে ছোট বাচ্চাটা সে তো বাবাকে দেখতেই পায়নি। তাদের যাতে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যায়, সেটার ব্যবস্থা আমরা করব।
এ সময় মন্ত্রী নিহত শিক্ষকের স্ত্রী সম্পা মাহমুদার পাশে গিয়ে গিয়ে তার অনুভুতির কথা শুনেন। মাহমুদা অশ্রুসিক্ত নয়নে বলেন, এই সংসারের একমাত্র উপর্জানকারী ছিল আরিফুল। সে আজকে না থাকায় পরিবারটি একেবারে নিশ্চিন্ন হয়ে গেছে, কে ধরবে সংসারের হাল। একজন গ্রেফতার হলেও বাকী আসামীরা গ্রেফতার হয়নি।তারা বিভিন্ন সময় আমাদেরকে বিভিন্ন হুমকী-ধামকী প্রদর্শন করছে। আমরা এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভোগছি। হামলাকারীরা এখনো এই হত্যাকান্ডের সাথে জড়ীতদের গ্রেফতার করে দ্রুত বিচার কামনা করেন। এ সময় সম্পা গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট থাকায় এই পরিবারের হাল ধরার জন্য একটা কর্মসংস্থানের জন্য মন্ত্রীর নিকট দাবী জানান।
এ সময় লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক মুহাঃ রাশেদুল হক প্রধান, জেলা পরিষদ প্রশাসক এ কে এম মমিনুল হক এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এ কে এম ফজলুল হক উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য মাদক ও অনলাইন জুয়ার প্রতিবাদ করায় প্রতিবেশী মৃত আনোয়ার হোসেনের ছেলে রহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে ওই গ্রামের হাসান আলী, মেহেদী হাসান, পারভেজ, মমিন মিয়া ও হৃদয় মিয়াসহ কয়েকজনের নেতৃত্বে একটি বড় অনলাইন জুয়া পরিচালিত হচ্ছে। এ খবরে তাদের ডেকে নিয়ে সতর্ক করে এসব থেকে সরে আসার আহ্বান জানান কলেজশিক্ষক আরিফুল ইসলাম। সরে না এলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবগত করার ঘোষণা দেন তিনি। সমাজ থেকে সামাজিক অপরাধ দমনের এ ঘোষণাই কাল হয়ে দাঁড়ায় কলেজশিক্ষকের।
গত ১ আগস্ট প্রতিদিনের মতো কলেজ থেকে বাড়ি ফিরে উঠানে পৌঁছালে কলেজ শিক্ষক আরিফুল ইসলামকে ডেকে নেন জুয়ার হোতা রহিদুল। এ সময় আগে থেকে ওৎ পেতে থাকা রহিদুলের নেতৃত্বে জুয়া চক্রটি দেশি অস্ত্রে শিক্ষক আরিফুলের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। হামলাকারীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে আরিফুলের মাথায় কুপিয়ে রক্তাক্ত জখম করে।
পরে স্থানীয়রা রক্তাক্ত অবস্থায় আরিফুলকে উদ্ধার করে প্রথমে লালমনিরহাট সদর হাসপাতাল পরে রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালে ভর্তি করে। সেখানে অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা এভার কেয়ার হাসপাতালের আইসিইউ ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয় ঢামেক হাসপাতালে। বিভিন্ন হাসপাতালে টানা ২১ দিন বেঁচে থাকার লড়াই করে গত শুক্রবার মৃত্যুর কাছে হার মেনে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান কলেজশিক্ষক আরিফুল ইসলাম।
হামলার ঘটনার পরদিন ২ আগস্ট শিক্ষক আরিফুলের বাবা আবু বক্কর সিদ্দিক বাদী হয়ে রহিদুলকে প্রধান করে ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। এ মামলায় প্রধান দুই অভিযুক্ত বাদে আটজনই জামিনে মুক্তি পেয়েছে। তারা মুক্তি পেয়ে মামলা তুলে নেয়ার হুমকি দেন। যা নিয়ে আরিফুলের পরিবার থানায় লিখিত জানালেও তা কর্ণপাত করেনি পুলিশ। এ নিয়ে পুলিশের প্রতি ক্ষুব্ধ আরিফুলের পরিবার ও স্বজনরা। এ মামলার প্রধান অভিযুক্ত রহিদুলকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। পরে এ মামলায় তাকে তিনদিনের রিমান্ড দিয়েছেন আদালত। যা শনিবার শেষে রহিদুলকে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ।
এদিকে গত ৬ আগস্ট আরিফুলের গর্ভবতী স্ত্রী শম্পা বেগম ক্লিনিকে অস্ত্রোপচার করে ছেলে সন্তানের জন্ম দেন। সমাজ আলোকিত করতে গিয়ে কলেজশিক্ষক আরিফুলকে জীবন দিতে হলো। সদ্য জন্ম নেওয়া সন্তানের মুখও দেখে যেতে পারলেন না তিনি।
শুক্রবার (২১ আগষ্ট) আরিফুলের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে উত্তেজিত জনতা অভিযুক্তদের আটটি বাড়িতে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে। এর মধ্যে চারটি বাড়ি সম্পূর্ণরূপে আগুনে পুড়ে ছাই হয়েছে। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে গোটা এলাকা। মব সৃষ্টির শঙ্কায় প্রায় তিন ঘণ্টা পরে ঘটনাস্থলে পৌঁছে আদিতমারী ও সদর থানা পুলিশসহ ফায়ার সার্ভিসের একটি দল। তারা ৩০ মিনিট চেষ্টার পরে আগুনসহ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে।
রেজাউল করিম রাজ্জাক, বিশেষ প্রতিনিধি ;- 































