আল্লাহ তায়ালার পরে মুমিন হৃদয়ে অপার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার আসনে যিনি আসীন তিনি আমাদের নবীজি মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মুহাব্বাত ও ভালোবাসা দ্বীন ও ইমানের অংশ। তাঁর প্রতি ভালোবাসার নিরিখেই পরিমাপিত হয় কেউ কতোটা মুমিন আর কতোটা মুনাফিক!
কোরআন মাজীদের বিভিন্ন জায়গায় এ কথা বলা হয়েছে। এক আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, বলুন, তোমাদের পিতা, তোমাদের পুত্র, তোমাদের ভাই, তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের আত্মীয়-স্বজন এবং ওই সম্পদ, যা তোমরা উপার্জন কর এবং ব্যবসা-বাণিজ্যযার ক্ষতির আশঙ্কা তোমরা কর এবং ওই ঘর-বাড়ি, যাতে তোমরা বসবাস কর, যদি তোমাদের কাছে আল্লাহর চেয়ে, তাঁর রাসূলের চেয়ে এবং তাঁর রাস্তায় জিহাদের চেয়ে অধিক প্রিয় হয়ে থাকে, তাহলে অপেক্ষা কর আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত। আল্লাহ সত্যত্যাগী সম্প্রদায়কে সৎপথ প্রদর্শন করেন না। (সুরা তাওবা: ২৪)
হাদিসে নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পবিত্র জবানিতেও এ সতর্ক বাণী উচ্চারিত হয়েছে। নবীজি (সা.) বলেছেন, তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত আমি তার কাছে তার পিতা থেকে, পুত্র থেকে এবং সকল মানুষ থেকে অধিক প্রিয় না হবো। (সহিহ বুখারি: ১৫; সহিহ মুসলিম: ১৭৭)
নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রতি আমাদের ভালোবাসা প্রকাশের নানা উপায় ও পন্থা বর্ণিত হয়েছে কোরআন-হাদিসে। ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রকাশের যে সকল পদ্ধতি শরীয়ত আমাদের নির্দেশ করছে তার একটি হলো দরুদ পাঠ করা। আল্লাহ তায়ালা কোরআনে বলছেন, আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি রহমত প্রেরণ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরা নবীর জন্য রহমতের তরে দোয়া করো এবং তাঁর প্রতি সালাম প্রেরণ করো। (সুরা আহযাব: ৫৬)
নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলছেন, যে ব্যক্তি আমার প্রতি একবার দরুদ পাঠ করবে, আল্লাহ তায়ালা তার প্রতি দশবার রহমত নাজিল করবেন। (সহিহ মুসলিম: ৩৮৪)
একজন মুমিনের সব চেয়ে বড় পুঁজি আল্লাহ তায়ালার রহমত। আল্লাহ তায়ালার রহমত বর্ষিত হয় যার ওপর সে তো পৃথিবীতে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান একজন মানুষ। নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর রহমত লাভের কত সহজ একটি উপায় বলে দিচ্ছেন—দরুদ পাঠ। নবীজির ওপর একবার দরুদ পাঠ করলে দশবার রহমাত নেমে আসবে আপনার ওপর। এমন নেয়মাত কি তুচ্ছ করা চলে!
আমাদের তো এখন কর্তব্য উঠতে বসতে হারহামেশা জিহ্বাকে সিক্ত রাখা নবীজির প্রতি দরুদ উচ্চারণে। কত সময় আমরা বেকার বসে থাকি! জীবনের কত মুহূর্ত কেটে যায় অনর্থক আলাপনে! অথচ আমি চাইলেই দরুদ পাঠের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার রহমত পেতে পারি।
নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওপর দরুদ পাঠ করার একটি বিশেষ সময় হলো শেষ রাত। যখন বিশ্ব চরাচর নিস্তব্ধ। রাতের অন্ধকারের মতোই পৃথিবী তলিয়ে আছে ঘুমের অতলে তখন আপনি জেগে উঠুন। হৃদয়কে আপ্লুত করে তুলুন দরুদ শরীফের একেকটি হরফের উচ্চারণে। দেখবেন-অনাবিল প্রশান্তি নেমে আসবে আপনার জীবনের অলিন্দে।
উবাই ইবনে কা’ব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাতের দুই-তৃতীয়াংশ চলে যাওয়ার পর রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘুম থেকে জেগে দাঁড়িয়ে বলতেন, হে মানব সকল! তোমরা আল্লাহ তা’আলাকে স্মরণ কর, তোমরা আল্লাহ তা’আলাকে স্মরণ কর। কম্পন সৃষ্টিকারী প্রথম শিঙ্গাধ্বনি এসে পড়েছে এবং এর পরপর আসবে পরবর্তী শিঙ্গাধ্বনি। মৃত্যু তার ভয়াবহতা নিয়ে উপস্থিত হয়েছে, মৃত্যু তার ভয়াবহতা নিয়ে উপস্থিত হয়েছে।
উবাই (রা.) বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমি তো অধিক হারে আপনার প্রতি দরুদ পাঠ করি। আপনার প্রতি দরুদ পাঠের জন্য আমি আমার সময়ের কতটুকু খরচ করবো? তিনি বললেন, তুমি যতক্ষণ ইচ্ছা করো। আমি বললাম, এক-চতুর্থাংশ সময়? তিনি বললেন, তুমি যতটুকু ইচ্ছা করো, তবে এর চেয়ে অধিক পরিমাণে পাঠ করতে পারলে এতে তোমারই মঙ্গল হবে। আমি বললাম, তাহলে আমি কি অর্ধেক সময় দরুদ পাঠ করবো? তিনি বললেন, তুমি যতক্ষণ চাও, যদি এর চেয়েও বাড়াতে পারো সেটা তোমার জন্যই কল্যাণকর। আমি বললাম, তাহলে দুই-তৃতীয়াংশ সময় দরুদ পাঠ করবো? তিনি বললেন, তুমি যতক্ষণ ইচ্ছা করো, তবে এর চেয়েও বাড়াতে পারলে তোমারই ভালো। আমি বললাম, তাহলে আমার পুরো সময়টাই আপনার দরুদ পাঠে কাটিয়ে দেব? তিনি বললেন, তাহলে তোমার চিন্তা ও কষ্টের জন্য তা যথেষ্ট হবে এবং তোমার পাপসমূহ ক্ষমা করা হবে। (সুনানে তিরমিজি: ২৪৫৭, মুসনাদে আহমদ: ২১২৪২)
ইসলাম ডেস্ক 


























