উজানের ঢল এবং টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে লালমনিরহাটে তিস্তা নদীর পানি গতকাল বিপদসীমা অতিক্রম করেছিল। রাতভর পানি বিপদসীমার আশপাশে থাকলেও সোমবার সকাল থেকে পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। তবে গত ২৪ ঘণ্টা পানি বিপদসীমার কাছাকাছি অবস্থান করায় জেলার নিম্নাঞ্চল, চরাঞ্চল ও নদীতীরবর্তী এলাকাগুলো প্লাবিত হয়েছে। এতে জেলার পাঁচটি উপজেলার কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, সোমবার (২৯ জুন) সকাল ৬টায় তিস্তার পানি বিপদসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছিল। পরে সকাল ৯টায় তা বিপদসীমার ২ সেন্টিমিটার নিচে নেমে আসে। দুপুর ১২টায় পানি কমে ১৫ সেন্টিমিটার এবং বিকাল ৩টায় আরও কমে বিপদসীমার ১৭ সেন্টিমিটার নিচে নেমে যায়।
পানি কমতে শুরু করলেও তিস্তা নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন এলাকার বসতবাড়িতে ইতোমধ্যে পানি ঢুকে পড়েছে। অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে উঁচু স্থানে অবস্থান নিয়েছে। বন্যার কারণে বিভিন্ন এলাকায় স্যানিটেশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং কোথাও কোথাও নিরাপদ পানির সংকটও দেখা দিয়েছে।
এদিকে অধিকাংশ গবাদিপশুর খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। কারণ নদীতীরবর্তী এলাকার প্রাকৃতিক চারণভূমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এছাড়া খুদে শিক্ষার্থীরাও পড়েছে চরম ভোগান্তিতে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পানি প্রবেশ করায় জেলার অন্তত ছয়টি স্কুলে পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে।
বন্যার পানিতে অনেক গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে গেছে এবং মাছের ঘের ভেসে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বয়স্কদের স্বাভাবিক চলাচলেও ব্যাঘাত ঘটছে। যদিও পানি কমতে শুরু করায় তিস্তা পাড়ের মানুষের আতঙ্ক কিছুটা কমেছে, তবে নতুন করে দেখা দিয়েছে নদীভাঙনের আশঙ্কা।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, উজানের ঢল এবং টানা বৃষ্টিপাতের কারণে তিস্তার পানি আবারও বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে বা এর কাছাকাছি অবস্থান করতে পারে। ফলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে তিস্তা নদীর ডান তীরকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
গরীবুল্লাহ এলাকার বাসিন্দা আলামিন ইসলাম বলেন, রাস্তায় পানি ওঠার কারণে আমরা বাড়িতে যেতে পারছি না। একজন অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য অটো নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু সম্ভব হয়নি। এখন অনেকটা পথ ঘুরে পানির মধ্যে দিয়েই যেতে হচ্ছে।
আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের গোবর্ধন এলাকার আব্দুর রশিদ বলেন, সারা আইত নিন্দ হয় নাই ভাই। বিছানার নিচত পানি। ছাওয়া পোয়া নিয়ে বিছানায় বসে আইত কাটাইছি। দুপুর থেকে একটু কমতেছে পানি। হামার কষ্ট কায়ো দেখে না বাহে। সরকারি লোকরা আসি সড়ক থেকি দেখি চলি যায়।
একই এলাকার জোনাব আলী (৫৫) বলেন, পানি বাড়লে গবাদিপশু নিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। গবাদিপশু নিয়ে উঁচু সড়কে রাত কাটাইছি। গরুগুলোকে খাওয়াতেও পারছি না, চারদিকে পানি আর পানি।
তিস্তাপাড়ের লোকজন জানান, পানি বৃদ্ধির কারণে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় তিস্তা পাড়ের অনেক বিদ্যালয়ে বন্যার পানি উঠেছে। ফলে এসব বিদ্যালয়ের পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। বন্যার পানিতে ডুবে আছে চরাঞ্চলের অনেক রাস্তা ঘাট। নৌকা আর ভেলা হয়েছে চরাঞ্চলের মানুষের চলাচলের একমাত্র মাধ্যম। বন্যা দুর্গতদের মাঝে বিশুদ্ধ পানি আর শুকনো খাবারের সংকট দেখা দিলেও প্রসাশনের তৎপরতা দেখা যায়নি তিস্তাপাড়ে। বিগত বন্যায় স্বাস্থ্যকর্মীরা অস্থায়ী ক্যাম্প করলেও চলতি বন্যায় তাদের দেখা যায়নি। ফলে বন্যাদুর্গত এলাকায় নানান রোগে আক্রান্তের শঙ্কা রয়েছে।
গোবর্ধন হাট ইসমাইল পাড়া সরকারী প্রাখমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুস সালাম বলেন, প্রতি বছর বন্যা হলেই তিস্তার পানিতে আমার বিদ্যালয়সহ ৭ টি বিদ্যালয়ের মাঠে পানি প্রবেশ করার জন্য ছাত্র-ছাত্রীরা বিদ্যালয়ে আসতে পারে না। এর ফলে বিদ্যালয় বন্ধ রাখতে হয়। তবে তিস্তা পানি প্রবেশ বন্ধ করতে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন ছাড়া সম্ভব নয়।
স্কুল শিক্ষার্থী হাবিবুর ইসলাম বলেন, বাড়িতে ও রাস্তায় পানি উঠেছে। আমরা স্কুল বা প্রাইভেটে যেতে পারছি না। ভেজা কাপড় নিয়ে কোথাও যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। প্রায়ই এমন সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। আমরা এর স্থায়ী সমাধান চাই।
লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল কুমার বলেন, দেশে ও উজানে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার কাছাকাছি বা তার ওপরে থাকতে পারে। এতে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। পানি বৃদ্ধি কিংবা কমে যাওয়ার পর নদীভাঙনের আশঙ্কাও রয়েছে। সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রস্তুত রয়েছে। বিশেষ করে তিস্তার ডান তীর বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
রেজাউল করিম রাজ্জাক, বিশেষ প্রতিনিধি ;- 
























