দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যজোটের অভিন্ন প্রার্থী হিসেবে এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি পদে ১১ দলের প্রার্থী হয়ে কর্নেল অলি আহমদ বলেন, ‘জাতির সঙ্গে বেইমানি করব না।’
রোববার (৯ আগস্ট) রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার বাসভবনে জোট শরিকদের বৈঠক শেষে এ সিদ্ধান্তের কথা জানান বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
বেলা সাড়ে ১১টার দিকে অনুষ্ঠিত বৈঠকটি সভাপতিত্ব করেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। বৈঠকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, বিএনপি সরকারের নির্বাচন-পরবর্তী অবস্থান, গণভোটের রায়, জুলাই সনদ ও এর বাস্তবায়নসহ দেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠক শেষে অলি আহমদ বলেন, ‘আমি ১১ দলের সকলের প্রতি কৃতজ্ঞ। বাংলাদেশের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞ। সবাই মনে করেছে আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এবং পরীক্ষিত একজন লোক-যার বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোন অভিযোগ নাই। শিক্ষাগত যোগ্যতার কোন অভিযোগ নাই। সুন্দরভাবে জীবন যাপন করেছি বিধায় সবাই সর্বসম্মতিক্রমে আমার নাম প্রস্তাব করেছে। আমি সমগ্র জাতির কাছে কৃতজ্ঞ। ১১ দলীয় ঐক্যজোটের সকলের কাছে কৃতজ্ঞ। আমাদের সকল নেতাকর্মীদের কাছে কৃতজ্ঞ।’
তিনি আরও বলেন, ‘আপনাদের মাধ্যমে আমরা জাতিকে বলতে চাই- আমরা আমাদের জায়গা থেকে এই জাতির সাথে কখনো বেইমানি করবো না। আমরা জনগণের পাশে সবসময় তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য দাঁড়াবো।’
বৈঠকের আলোচনার বিষয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, বিএনপি সরকারের নির্বাচন-পরবর্তী অবস্থান, গণভোটের রায়, জুলাই সনদ এবং এর বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন বিষয় উঠে এসেছে।
তিনি বলেন, জুলাই সনদ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কমিশনে আলোচনা হয়েছে। সেখানে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কীভাবে হবে, সে বিষয়ে একটি নতুন ফর্মুলার প্রস্তাবও এসেছিল, যাতে আমরা সবাই মিলে একজন সর্বজনগ্রহণযোগ্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করতে পারি। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া সংশোধন এবং ক্ষমতার ভারসাম্যের জায়গা থেকে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কীভাবে আরও বাড়ানো যায়, সে বিষয়েও আলোচনা হয়েছিলো।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমাদের প্রত্যাশা ছিল, নির্বাচনের পর জুলাই সনদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। গণভোটে জনগণ যে ম্যান্ডেট দিয়েছে- প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ জুলাই সনদের পক্ষে রায় দিয়েছে- তার ভিত্তিতে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হবে, সংবিধান সংস্কার পরিষদ হবে এবং এর মাধ্যমে সংস্কারকৃত সংবিধানের অধীনে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা হবে। এটাই ছিল আমাদের প্রত্যাশা।’
বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ বলেন, ‘কিন্তু আমরা দেখেছি, এই সরকার গণভোটের গণরায়কে অস্বীকার করেছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগই তারা নেয়নি। সংস্কার পরিষদের শপথ হয়নি, অধিবেশন ডাকা হয়নি। একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণের অভিযোগও উঠেছে; নির্বাচন কমিশনকেও দলীয়করণ করা হচ্ছে বলে আমরা মনে করি।’
নাহিদ ইসলাম বলেন, বিএনপির গত ১৬ বছরের আন্দোলনে অন্যতম দাবি ছিল শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। এ ক্ষেত্রে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু আমরা দেখছি, এই সরকারও পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার পথেই হাঁটছে।
তিনি বলেন, ‘সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনেই বলেছিলাম, ফ্যাসিবাদের দোসর চুপুকে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অপসারণ করে দ্রুত নতুন রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করতে হবে এবং তা জুলাই সনদ অনুযায়ী করতে হবে। কিন্তু তারা তাকে ছয় মাস রাষ্ট্রপতি হিসেবে রেখে দিয়েছে। এখন তাকে কোনো ধরনের বিচারের আওতায় না এনে একটি ‘ফ্রি এক্সিট’ দেওয়া হচ্ছে- এ বিষয়টিও আমাদের কাছে সন্দেহজনক।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই ছয় মাস সময় বাড়ানোর পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা ষড়যন্ত্র আছে কি না, সেটিও আমাদের ভাবতে হচ্ছে। কারণ আমরা জানি, পরবর্তী পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার কীভাবে হবে এবং তখন রাষ্ট্রপতির ভূমিকা কী হবে-এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফলে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নিয়ে জাতির মধ্যে একটি সন্দেহ তৈরি হচ্ছে।’
নাহিদ ইসলাম বলেন, বিএনপির অতীত ইতিহাসেও আমরা দেখেছি, তারা বিভিন্ন সময় ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়াকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেছে এবং এর ফলে দেশে একাধিক রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকট তৈরি হয়েছে। এসব দীর্ঘমেয়াদি বিষয়ও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে পরবর্তী সময়ে আরও বিস্তারিত কথা বলবেন বলেও জানান তিনি।
নাহিদ ইসলাম জানান, আজকের বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো- রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ১১ দলের পক্ষ থেকে অংশ নেওয়া এবং একজন প্রার্থী দেওয়া। ১১ দল যেহেতু সংসদের ভেতরে ও বাইরে গণভোটের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধভাবে অবস্থান করছে, তাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও তাদের একজন অভিন্ন ও ঐক্যবদ্ধ প্রার্থী থাকবেন।
এরই ধারাবাহিকতায় জোটের প্রার্থী হিসেবে এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নাম চূড়ান্ত করা হয়।
এর মধ্য দিয়ে ১৯৯১ সালের পর রাষ্ট্রপতি পদে দ্বিতীয় বারের মতো নির্বাচন হতে যাচ্ছে। সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের পর ১৯৯১ সালে একমাত্র বিরোধী দল থেকে প্রার্থী দেওয়ার নজির রয়েছে। সেই সময়ে আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থেকে রাষ্ট্রপতি পদে বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে মনোনয়ন দিয়েছিল। সেই নির্বাচনে তিনি বিএনপি প্রার্থী আব্দুর রহমান বিশ্বাসের কাছে ৮০ ভোটে পরাজিত হন। এরপর থেকে প্রতিবারই ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন।
চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০টি আসনের মধ্যে বিএনপি ২১১ আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। আর জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট ৬৮টি আসন অর্জন করেছে।
এছাড়া বিএনপি জোট শরিকদের মধ্যে বিজেপি, গণসংহতি আন্দোলন ও গণঅধিকার পরিষদ একটি করে আসন লাভ করে। জামায়াতের জোটের জাতীয় নাগরিক পার্টি ৬টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২টি ও খেলাফত মজলিস একটি আসন লাভ করে। এ ছাড়া স্বতন্ত্র ৭ জন ও ইসলামী আন্দোলন একটি আসন অর্জন করেছে।
রোববারের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, জাগপা সহসভাপতি রাশেদ প্রধান, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার ফুয়াদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ প্রমুখ।
অনলাইন ডেস্ক : 


























