শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে একের পর এক বিতর্কিত নানা সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। এতে বারবার শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্টদের সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে এ মন্ত্রণালয় ও তার দায়িত্বে থাকা মন্ত্রীকে। এসব সিদ্ধান্ত ঘিরে মাঠপর্যায়ে আন্দোলনও হয়েছে কয়েকবার। সমালোচনার মুখে একাধিক সিদ্ধান্ত থেকে সরেও আসতে হয়েছে। দাবি ওঠে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগেরও। বেফাঁস মন্তব্যের কারণে সংসদে ক্ষমা চাইতে হয়েছে মন্ত্রীকে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ও অংশীজনের মতামত যথাযথভাবে বিবেচনা করা না হলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। ফলে কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার আগেই তা নিয়ে বিতর্ক দেখা দিচ্ছে। তাই মন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়কে আরও ধীরেসুস্থে চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অন্যথায় আবারও শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের আস্থার সংকটে পড়তে হবে শিক্ষামন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়কে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বৈশ্বিক জ্বালানিসংকট ও ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার কথা বিবেচনায় চলতি বছরের এপ্রিলে রাজধানীসহ মহানগর এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ব্লেন্ডেড (অনলাইন ও সশরীরে) পদ্ধতিতে সিদ্ধান্ত নেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে অভিভাবকদের তীব্র আপত্তি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অনাগ্রহের কারণে তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। এরপর প্রথম শ্রেণি থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত লটারি পদ্ধতিতে ভর্তির সিদ্ধান্ত বাতিল করে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার কথা জানান শিক্ষামন্ত্রী। এ ঘোষণার পর কোচিং বাণিজ্য ফিরে আসার প্রবণতা দেখা দেয়। ফলে সিদ্ধান্তটি অভিভাবকদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে।
পরে সেই সিদ্ধান্তেও টিকে থাকতে পারেনি মন্ত্রণালয়। আগের মতোই প্রথম শ্রেণিতে লটারির মাধ্যমে ভর্তি নেওয়া হবে বলে জানানো হয়। সর্বশেষ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএর) কাছ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির হাতে নেওয়ার আলোচনা হয় মন্ত্রণালয়ের এক সভায়। এ নিয়ে গত সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল-সংগঠন বিবৃতি ও বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে এর প্রতিবাদ জানায়। পরে গতকাল মঙ্গলবার শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, ‘একটি সভার রেজল্যুশনের আলোচনার অংশবিশেষ কেটে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে। বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত বা প্রজ্ঞাপন নয়।’
শুধু এসব ঘটনা নয়, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগ, বেসরকারি স্কুল-কলেজের কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ ডিসিদের থেকে সরিয়ে ম্যানেজিং কমিটির হাতে তুলে দেওয়া, প্রাথমিকের বদলি মাঠপর্যায়ে নিয়ে যাওয়া,
প্রতিষ্ঠান প্রধানদের নিয়োগ পরীক্ষা হলেও ভাইভা না নেওয়া, প্রাথমিকের বদলি কমিটিতে ‘গণমান্য ব্যক্তি’ যোগ করা, দীর্ঘদিন অ্যাডহক কমিটি দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা, মন্ত্রীর এপিএসের দুর্নীতি, বৃষ্টির মধ্যে পরীক্ষা নেওয়া, শিক্ষার্থীদের নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর ‘বিতর্কিত’ মন্তব্যসহ নানা ইস্যুতে একাধিকবার সমালোচনার মুখে পড়েন শিক্ষামন্ত্রী ও তার মন্ত্রণালয়।
নিয়োগ ক্ষমতা ফেরানোর আলোচনায় সমালোচনা গত ৩ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এনটিআরসিএর সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে আয়োজিত এক সভায় শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতার বিষয়ে আলোচনা হয়। সভায় শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক, এনটিআরসিএর চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আলিফ রুদাবাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সভার কার্যবিবরণী থেকে জানা যায়, এতে সিদ্ধান্ত হয়েছে, বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০০৫ অনুযায়ী এখন থেকে এনটিআরসিএ শুধু নিবন্ধন ও প্রত্যয়নের কাজ করবে। অর্থাৎ এখন থেকে বেসরকারি স্কুল-কলেজে প্রবেশ পর্যায়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা আবারও প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের হাতে দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। এ নিয়ে ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
তবে গতকাল মঙ্গলবার বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘একটি সভার রেজুলেশনের আলোচনার অংশবিশেষ কেটে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে। বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত বা প্রজ্ঞাপন নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘একটি বিষয় আলোচনার টেবিলে ওঠার পর সেখান থেকে রেজুলেশন হয়ে মন্ত্রীর কাছে আসে। এটি কি চূড়ান্ত কোনো রাষ্ট্রীয়, প্রধানমন্ত্রী বা দলীয় সিদ্ধান্ত? একবারও তা যাচাই না করে হুট করে মিছিল শুরু করা অনভিপ্রেত।’
এর আগে গত মাসে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মচারী নিয়োগের ক্ষমতা ফের গভর্নিং বডি বা স্কুল ম্যানেজিং কমিটির হাতে ফেরানো হয়। গত বছরের সেপ্টেম্বরে এ ক্ষমতা জেলা প্রশাসকের (ডিসি) নেতৃত্বে গঠিত একটি কমিটির কাছে দেওয়া হয়েছিল। এ নিয়েও আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। এভাবে ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে নিয়োগে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ছিল। আর অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশের তিন মাস হয়ে গেলেও এখনো মৌখিক পরীক্ষার (ভাইভা) সময়সূচি প্রকাশ করেনি এনটিআরসিএ। দ্রুত মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার দাবিতে এরই মধ্যে মনাববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালন শুরু করেছেন লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণরা।
বৃষ্টির মধ্যে পরীক্ষা, ঘটে ‘লঙ্কাকাণ্ড’ টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার মধ্যে এইচএসসির একটি পরীক্ষা নেওয়া ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের একটি ‘বিতর্কিত’ মন্তব্যকে ঘিরে গত মাসে ঘটে লঙ্কাকাণ্ড। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। টানা কয়েকদিনের আন্দোলনে তীব্র তোপের মুখে শিক্ষার্থীদের নিয়ে দেওয়া নিজের মন্তব্যের জন্য জাতীয় সংসদ অধিবেশনে দুঃখ প্রকাশ করেন মন্ত্রী। তিনি সংসদে বলেন, ‘আমার ব্যক্তিগত একটি মন্তব্য নিয়ে অনেকেই আপত্তি করেছেন। আমি কাউকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কিছু বলিনি। তারপরও যদি কেউ আমার কথায় আহত হয়ে থাকেন, সিম্পলি আমি দুঃখ প্রকাশ করছি।’
সমালোচনার মুখে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষার সিদ্ধান্ত বাতিল ছয় বছর আগে সরকারি-বেসরকারি স্কুল-কলেজে ভর্তির জন্য ভর্তি পরীক্ষার পরিবর্তে চালু হয় লটারি পদ্ধতি। উদ্দেশ্য ভর্তি বাণিজ্য, প্রশ্ন ফাঁস ও কোচিং প্রবণতা কমানো। সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে আবারও প্রথম শ্রেণি থেকে ভর্তি পরীক্ষা চালুর কথা জানান শিক্ষামন্ত্রী মিলন। ঘোষণার পর সন্তানদের নিয়ে কোচিং সেন্টারে ছোটাছুটি শুরু করেন অভিভাবকরা। এ নিয়ে গত ১৬ জুলাই কালবেলায় ‘পরীক্ষা ফিরতেই কোচিংয়ে বসন্ত’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশ হয়। বিষয়টি নিয়ে তীব্র আপত্তি ও সমালোনা শুরু হয় বিভিন্ন মহল থেকে। সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে মন্ত্রণালয়।
তবে প্রথম শ্রেণি ছাড়া অন্য ক্লাসগুলোতে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত বহাল রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রথম শ্রেণিতে কোনো ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণ করা হবে না। এক্ষেত্রে লটারির মাধ্যমে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। এ ছাড়া প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অন্যান্য সব শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে ভর্তি করা হবে।
প্রাথমিকে বদলি কমিটিতে ‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’ বাদ দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বদলির ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ (ইউএনও) মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের। এতদিন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর শিক্ষকদের বদলি করলেও দুর্নীতি এড়াতে স্থানীয় প্রশাসনকে এই ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।
অনলাইন ডেস্ক : 


























