প্লাস্টিক ছাড়া আমাদের জীবন কল্পনা করা কঠিন। পানির বোতল, খাবারের প্যাকেট, খেলনা, কাপড়, ইলেকট্রনিকস—প্রায় সব জায়গাতেই প্লাস্টিকের ব্যবহার আছে। এটি হালকা, টেকসই এবং তুলনামূলকভাবে সস্তা। তাই সারা পৃথিবীতেই প্লাস্টিকের ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে।কিন্তু প্লাস্টিকের সমস্যা শুধু ব্যবহারের পর ফেলে দেওয়া জিনিস নিয়ে নয়। প্লাস্টিক তৈরির সময় এতে নানা ধরনের রাসায়নিক যোগ করা হয়। এসব রাসায়নিকের কিছু অংশ প্লাস্টিকের পণ্য থেকে বের হয়ে খাবার, পানি কিংবা বাতাসের সঙ্গে আমাদের শরীরে ঢুকতে পারে। বিজ্ঞানীরা এখন এসব রাসায়নিকের সঙ্গে মানুষের স্বাস্থ্যের বিভিন্ন সমস্যার সম্পর্ক খুঁজে দেখছেন।প্রতিবছর পৃথিবীতে প্রায় ৫০ কোটি টন প্লাস্টিক তৈরি হয়। এর প্রায় ৯৮ শতাংশই জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে তৈরি। বর্তমান নীতিতে বড় পরিবর্তন না এলে ২০৬০ সালের মধ্যে পৃথিবীতে প্লাস্টিকের ব্যবহার প্রায় তিন গুণ হয়ে যেতে পারে।প্লাস্টিকের এত বিপুল উৎপাদন যে শুধু পরিবেশের জন্য সমস্যা তৈরি করছে, তা নয়। প্লাস্টিকে হাজার হাজার ধরনের রাসায়নিক থাকতে পারে। এসবের কিছু প্লাস্টিকের পণ্য থেকে বের হয়ে খাবার ও পানিতে মিশতে পারে। আবার কিছু রাসায়নিক বাতাসেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে আমরা না চাইলেও প্রতিদিন বিভিন্ন উপায়ে এসব রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসতে পারি।ট্রাফিক সিগন্যালে নীল লাইটের মানে কীমাইক্রো বা ন্যানো প্লাস্টিক বাতাসে ভেসে বেড়াতে পারে অনায়াসেশরীরে কী প্রভাব পড়ে?প্লাস্টিকের রাসায়নিক নিয়ে গবেষণা এখনো চলছে। তবে বেশ কিছু গবেষণায় মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর এর সম্ভাব্য ক্ষতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালে অস্ট্রেলীয় দাতব্য সংস্থা মাইন্ডেরু ফাউন্ডেশন ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান জেবিআই মিলে মানুষের সাধারণভাবে সংস্পর্শে আসা প্লাস্টিক-সম্পর্কিত রাসায়নিক নিয়ে একটি বড় পর্যালোচনা প্রকাশ করে। সেখানে এসব রাসায়নিকের সংস্পর্শের সঙ্গে বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া যায়।এর মধ্যে আছে শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ, জন্মের সময় শিশুর বিভিন্ন সমস্যা, প্রজননস্বাস্থ্য, শরীরের বিপাকীয় ব্যবস্থা, হরমোন ও পুষ্টিসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়। পরে ২০২৬ সালে আরও গবেষণার ভিত্তিতে এই তালিকায় প্রজননস্বাস্থ্য, গর্ভাবস্থা, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ও হরমোন নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়ও যুক্ত করা হয়।অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে প্লাস্টিকের সংস্পর্শে এলেই কেউ অসুস্থ হয়ে পড়বে। বরং বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে কত ধরনের রাসায়নিকের সংস্পর্শে মানুষ আসছে, সেগুলো শরীরে কীভাবে প্রভাব ফেলতে পারে এবং কোন মাত্রায় ঝুঁকি তৈরি হয়, এসব বোঝার চেষ্টা করছেন।সমস্যার আরেকটি দিক হলো, প্লাস্টিকে ব্যবহৃত অনেক রাসায়নিক সম্পর্কে এখনো পর্যাপ্ত তথ্য নেই। ফলে কোন রাসায়নিক মানুষের জন্য কতটা নিরাপদ, সেটি সব ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।শুধু প্লাস্টিক কুড়িয়ে নিলেই কি সমাধান?প্লাস্টিকের দূষণ কমানোর জন্য আমরা সাধারণত কী করি? রাস্তাঘাট বা নদী থেকে প্লাস্টিক সংগ্রহ করি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করি, পুনর্ব্যবহার বা পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করার চেষ্টা করি। এগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, শুধু প্লাস্টিক ব্যবহারের পর কী করা হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজলেই সমস্যার পুরো সমাধান হবে না।কারণ, প্লাস্টিকের পণ্য তৈরি হওয়ার সময়ই যদি এতে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়, তাহলে সেই রাসায়নিকের ঝুঁকি পণ্যটি ফেলে দেওয়ার পর শুরু হয় না। পণ্য ব্যবহারের সময়ও মানুষ এসব রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসতে পারে।তাই সমস্যার সমাধান শুরু করতে হবে আরও আগে। প্লাস্টিক তৈরির পর্যায় থেকে। কোন রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে, সেগুলো কতটা নিরাপদ, কী ধরনের উপাদান দিয়ে প্লাস্টিক তৈরি হবে—এসব বিষয় শুরুতেই বিবেচনায় নিতে হবে।এ ধরনের পদ্ধতিকে বলা যায় ‘আপস্ট্রিম’ বা উৎস পর্যায়ের সমাধান। মানে, সমস্যা তৈরি হওয়ার পর সেটি সামলানোর বদলে শুরুতেই সমস্যাটি কমানোর চেষ্টা করা।বাসা চার-পাঁচতলায়, লিফট নেই, সিঁড়ি বেয়ে ওঠায় কী সুবিধাবিকল্প উপকরণের খোঁজপ্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে বিজ্ঞানীরা নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব বিকল্প উপকরণ তৈরির চেষ্টা করছেন। এসব উপকরণ যেন পরিবেশের জন্য ভালো হয়, মানুষের জন্যও নিরাপদ হয়, সেদিকে নজর দেওয়া হচ্ছে।এর একটি উদাহরণ হলো জীবাণু বা প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় সহজে ভেঙে যেতে পারে এমন প্লাস্টিক বা বায়োপ্লাস্টিক। কিছু গবেষণা ও প্রতিষ্ঠান এমন উপাদান তৈরির চেষ্টা করছে, যেগুলো প্রচলিত প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।আবার কেউ কেউ প্লাস্টিকের পরিবর্তে কাগজের মতো উপকরণকে আরও কার্যকর করার প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন। এমন প্রযুক্তিও তৈরি হচ্ছে, যা বায়োপ্লাস্টিককে দ্রুত ভেঙে যেতে সাহায্য করতে পারে।তবে নতুন কোনো উপকরণ তৈরি করলেই সেটি দ্রুত সারা পৃথিবীতে ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। গবেষণা, অর্থায়ন, উৎপাদনব্যবস্থা এবং নীতিমালার প্রয়োজন হয়। একটি নতুন উপকরণকে পরীক্ষাগারের পর্যায় থেকে বড় পরিসরে উৎপাদন ও ব্যবহারের পর্যায়ে নিতে সময় এবং অর্থ দুটোই লাগে।প্লাস্টিকের রাসায়নিক নিয়ে কাজ করছেন এমন গবেষকেরা মনে করেন, শুধু বিজ্ঞানীদের গবেষণা বা কোম্পানির নতুন প্রযুক্তি তৈরি করাই যথেষ্ট নয়। সরকারের নীতিতেও পরিবর্তন দরকার।সূত্র: সিএনএন হেলথকয়েক দশক ধরে চলছে আর্জেন্টাইন পিঁপড়াদের বিশ্বযুদ্ধ
প্লাস্টিকের রাসায়নিক আমাদের শরীরের কী ক্ষতি করছে
-
অনলাইন ডেস্ক : - আপডেট সময় ০৯:৩৯:২৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬
- 26
















