শনিবার , ১৩ এপ্রিল ২০১৯ | ৯ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ
  1. আইন ও অপরাধ
  2. আজকের আবহাওয়া পূর্বাভাস
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আপনার স্বাস্থ্য
  5. ইতিহাসের এই দিনে
  6. উত্তরাঞ্চলের খবর
  7. উপজেলা পরিষদ নির্বাচন
  8. কৃষি, অর্থ ও বাণিজ্য
  9. খেলাধুলা
  10. চাকরির খবর
  11. দেশ প্রতিদিন
  12. ধর্ম ও জীবন
  13. নারী ও শিশু
  14. প্রতিদিনের কথা
  15. প্রতিদিনের রাশিফল

আমাদের পান্তায় ইলিশের বিলাসিতা

প্রতিবেদক
admin2022
এপ্রিল ১৩, ২০১৯ ৬:০৫ অপরাহ্ণ

বিজয় ডেস্ক: এ দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী নিম্নবিত্তের মানুষ আর্থিক দৈন্যের কারণে প্রতিদিন অনেক কষ্টে জোগাড় করা রাতের সামান্য ভাত পানিতে ভিজিয়ে রেখে সকালে পান্তা আর কাঁচামরিচ দিয়ে দিনের শুরু করেন। তাদের জন্য নববর্র্ষে সেই পান্তা গ্রহণই কতটা আনন্দ বয়ে নিয়ে আনবে? আর পহেলা বৈশাখের ইলিশ কেনা তারা স্বপ্নেও ভাবেন না। তাই রমনা বটমূলে বাঙালির পান্তা-ইলিশ উৎসব আর মুষ্টিমেয় কিছু বিত্তবানের ছাড়া অন্যদের খুব একটা দেখা মিলবে না! এ ছাড়া বাংলা নববর্ষ ছাড়াও ঈদ, পূজা-পার্বণে সুযোগসন্ধানী ব্যবসায়ীরা অনেক আগ থেকেই অতিরিক্ত মুনাফা লাভের আশায় ইলিশ মজুদের পাহাড় গড়ে তোলেন। মাঝেমধ্যে বাজারে গেলে ইলিশ নিয়ে নানা আলোচনা, মন্তব্য এমনকি নববর্ষে ইলিশের আকাশছোঁয়া দাম শুনে ভড়কে যেতে হয়। পত্রিকায় একটি ইলিশের দাম সতেরো হাজার টাকা পর্যন্ত উঠতে শুনেছি। শরীয়তপুরের সুরেশ^রে আড়াই কেজি ওজনের একটি মাত্র ইলিশ বিক্রি হয়েছে পনেরো হাজার টাকায়। ইলিশের এমন আকাল সময়ে এত বড় মাছ প্রাপ্তি দুর্লভ বৈকি! মানুষের আয়, কেনাকাটার সামর্থ্য দিন দিন বাড়ছে। তাতে আগামী বছর একটি ইলিশ বিশ হাজার টাকায় বিক্রি হবে এটা আর বিচিত্র কি! অথচ বাঙালির জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে আজ ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা জাতীয় মাছ ইলিশের স্বাদ গ্রহণ সারা বছর আজ সাধারণ মানুষের কাছে দুঃস্বপ্ন বৈ কিছু নয়।

দৃষ্টিনন্দন, রসনালোভন ইলিশ নতুন প্রজন্মের কাছে ধীরে ধীরে অপরিচিত হয়ে যাচ্ছে। ইলিশ প্রজননের প্রতিক‚ল পরিবেশ, বেপরোয়াভাবে মা ইলিশ ও জাটকা নিধনই আবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহী ইলিশের এমন সংকটের মূল কারণ। সারা বছর ধরে এমনকি জাটকা নিধনের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাকালেও সব আইন-কানুন উপেক্ষা করে নদ-নদীতে চলে অবাধে জাটকা নিধনের মহোৎসব। কারেন্ট জাল ফেলে ধরে ফেলা হয় জাটকা বলে পরিচিত ৯ ইঞ্চির ছোট আকারের ইলিশ। অথচ প্রতিবারের মতো এ বছরও মার্চ থেকে এপ্রিল দুমাস জাটকা ধরা, ক্রয়-বিক্রয় পরিবহন, মজুদ ও বাজারজাতকরণ নিষিদ্ধ থাকলেও বাজারে জাটকাসহ সব ধরনের ইলিশ বিক্রি হতে দেখা গেছে। মাঝে মাঝে জাটকার দুয়েকটি জাটকার চালান ধরাও পড়ছে।

দেশজুড়ে জালের মতো বিস্তৃত নদীগুলো আজ শুকিয়ে গেছে। নদীর বুকজুড়ে জেগে উঠেছে বিশাল চর। ইলিশ মাছের প্রজনন ও বৃদ্ধি উদ্বেগজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। উপরন্তু নৌকার যান্ত্রিকায়ন ও অধিকসংখ্যক মানুষ মাছ ধরার কাজে নিয়োজিত থাকায় নষ্ট করে দেয়া হচ্ছে ইলিশ উৎপাদনের অপার সম্ভাবনা। ইলিশ মাছ প্রজননের ও বিচরণের প্রধান ক্ষেত্র পদ্মা-মেঘনার পানির প্রবাহ হ্রাস এবং ভয়াবহ পানি দূষণের কারণে মাছের বৃদ্ধি ও বিস্তৃতি ব্যাপকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। জানুয়ারি থেকে মার্চ- এ তিন মাস সাধারণত নদীগুলোতে প্রচুর জাটকা জন্মে। শুধু মেঘনার বিভিন্ন বিচরণ ক্ষেত্র থেকে বছরে প্রায় ২০-২২ হাজার টন জাটকা উৎপাদিত হয়। এসব জাটকা পূর্ণবয়স্ক ইলিশ হলে এর ওজন হতে পারে ১২-১৪ লাখ টনের বেশি। অথচ ইলিশ বেড়ে ওঠার আগেই জাটকা ধরে ফেলার কারণে ইলিশ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। দেশকে হতে হচ্ছে বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন।

মা ইলিশের ডিম ছাড়ার মৌসুমে সামান্য কয়টা দিন নদীতে মাছ ধরা এবং মাছ পরিবহন, মজুদ ও বাজারজাত করা নিষিদ্ধ থাকে। আশ্বিন মাসের ভরা পূর্ণিমার আগের পাঁচ দিন ও শেষ পাঁচ দিন মা ইলিশ সাগরের গভীর থেকে ডিম ছাড়তে উঠে এসে ঝাঁকে ঝাঁকে মিঠা পানিতে নির্দিষ্ট স্থানে জড়ো হয়। পুরুষ মাছও ওদের পিছু নেয়। ইংরেজি মাসের হিসাবে এ সময়টা ৫ থেকে ১৫ অক্টোবর। বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে ইলিশের ডিম ছাড়ার সময়টি দীর্ঘায়িত হয় এবং মা মাছের ডিম ছাড়তে আরো বেশ সময় পার হয়ে যায়। কাজেই মাছ ধরার জন্য নিষেধাজ্ঞার নির্দিষ্ট সময়টি পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জেলেদের হাতে অজস্র ডিমওয়ালা মা ইলিশ ধরা পড়ে যায়। কাজেই ইলিশ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময় বৃদ্ধি করা হলে ইলিশ উৎপাদন বহুলাংশে বৃদ্ধি পেতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ। আবহমানকাল ধরে ইলিশ বাংলার মানুষের জীবন-জীবিকা এবং অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত। আত্মকর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে ইলিশের গুরুত্ব অপরিসীম। মা ইলিশ দেশের নদী ও নির্দিষ্ট নদী মোহনায় ডিম ছাড়লেও ইলিশ বৃদ্ধি লাভ করে বাংলাদেশের সাগরের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে। বিশেষ কোনো পরিচর্যা ছাড়াই এ মাছ নদ-নদীতে তরতর করে বেড়ে ওঠে। পরিপূর্ণ করে দেয় নদীর অসীম জলরাশি। জাটকা রক্ষা করা গেলে প্রায় ২ লাখ টন জাটকা পাওয়া সম্ভব এবং তা পূর্ণবয়স্ক ইলিশে পরিণত হলে তার বাজার মূল্য হবে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। একটি মা ইলিশ লাখ লাখ ডিম ছাড়লেও রেণুপোনা বাঁচে মাত্র ১০ ভাগ- এ হিসাবটি জেলেসহ ইলিশ ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে মনে রাখতে হবে। নদীতে মাছ থাকলেই মৎস্যজীবীরা বেঁচে থাকবেন। পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্ক ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে বাজারে সরবরাহ বেড়ে দামও কিছুটা কমে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নেমে আসবে। বর্তমানে দেশে উৎপাদিত মাছের শতকরা ১২ ভাগ হচ্ছে ইলিশ।

জাটকা রক্ষা করে ইলিশের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছতে হলে মৎস্যজীবীদের আপদকালীন জাটকা আহরণ নিষিদ্ধকালীন জীবিকা নির্বাহের জন্য খাদ্য ও আর্থিক সাহায্য প্রদানসহ বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে জেলেদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য হ্রাস করার লক্ষ্যে তাদের নৌকা, জাল, মাছ ধরার অন্যান্য উপকরণ সরবরাহের ব্যবস্থা করা জরুরি। জলদস্যুর হাত থেকে জেলেদের জানমাল রক্ষা করতে বিশেষ দৃষ্টি দেয়া অত্যাবশ্যক। দেশের নদনদীর পানি প্রবাহ, জলজ পরিবেশ ও আবহাওয়ার পরিবর্তিত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিউটের গবেষণালব্ধ উপাত্তের বাস্তব প্রয়োগ ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধিতে অধিক সাফল্য বয়ে আনতে সক্ষম যা পক্ষান্তরে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। জাটকা নিধন বন্ধ করে ইলিশ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছলে বাংলাদেশের মানুষের শরীরের আমিষ চাহিদা মিটিয়ে প্রচুর পরিমাণ বাড়তি ইলিশ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা যেতে পারে। শুধু নববর্ষে বিত্তবানদের পান্তা-ইলিশের উৎসবে নয়, সারা বছরই দেশের সর্বস্তরের মানুষ কমবেশি ইলিশের স্বাদ গ্রহণ করতে পারবেন। বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ঐতিহ্যবাহী রূপালী ইলিশ আবার মৎস্যজীবীদের জীবনে নিয়ে আসবে হারিয়ে যাওয়া সোনালি দিন।

ছবি ও তথ্য – ইন্টারনেট

সর্বশেষ - ফিচার