ঢাকা ০৯:০৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১২ জুলাই ২০২৪, ২৮ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

ঘটনাবহুল মহরম ও আশুরার তাৎপর্য

আজ পবিত্র আশুরা বা মহরম মাসের দশম তারিখ। মুসলিম ধর্ম, সমাজ ও সংস্কৃতিতে মহরম, আশুরা ও কারবালা অতি ব্যাপক অর্থবোধক তিনটি পরিভাষা। ইসলামী মূল্যবোধে এ তিনটির প্রভাবও বেশ সুদূরপ্রসারী। হাদিস শরীফে একক দিন হিসেবে আশুরার যে তাৎপর্য বর্ণিত হয়েছে তার সারসংক্ষেপ হলো- এ পবিত্র দিনে আল্লাহ্ তায়ালা অসংখ্য নবী-রাসুল দুনিয়ার মানুষের কল্যাণে বিভিন্ন সময় আবির্ভূত করেছেন। আশুরার দিনে আল্লাহ্ সুবহানাহু তায়ালা আসমান-যমিন, পাহাড়-পর্বত, তারকারাজি, আরশ-কুরসি, লওহে মাহফুজ ও ফেরেশতাদের সৃষ্টি করেন। এদিন আদম, হাওয়াকে (আ.) সৃষ্টি করা হয়েছে। এ দিনেই তাদেরকে বেহেশতবাস দেয়া হয়।

আবার এ দিনেই তাদেরকে বেহেশত থেকে নির্গত করে দুনিয়ায় প্রেরণ করা হয়। এদিন অন্তত দু’হাজার পয়গাম্বর জন্মগ্রহণ করেন এবং অন্তত ২ হাজার পয়গাম্বর ওফাতপ্রাপ্ত হন। হযরত আদম-হাওয়ার তাওবা কবুল হয়েছিল এদিনে। আর অঝোর ধারায় রহমতের বৃষ্টির সূচনা হয়েছিল এদিনে। পৃথিবী ধ্বংসপ্রাপ্তও হবে এদিনে। মহানবী হযরত মুহম্মদ (সা.) কে এদিনেই চিরতরে নিষ্পাপ ঘোষণা করা হয়েছিল। এদিনেই মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পৃথিবীকে বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে সাজিয়েছেন, আবাসযোগ্য করেছেন। আল্লাহ তাঁর অনেক পেয়ারা বান্দাকে এদিন তাঁর করুণাসিক্ত করেছেন। এদিন নমরুদ কর্তৃক ইবরাহিম নবী (আ.) এর জন্য তৈরি অগ্নিকু-কে আল্লাহতায়ালা শান্তির গুলিস্তায় পরিণত করেছিলেন।

এদিন ইউনুস নবী মাছের উদর থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন, ইয়াকুব নবী ফিরে পেয়েছিলেন তার প্রাণের দুলাল ইউসুফ (আ) কে। আবার এদিন ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে অনেক দাম্ভিক, খোদাদ্রোহীকে শাস্তি দান করেছেন। এ দিন মুসা নবী (আ.) কে তাড়াতে গিয়ে নীল নদে কুখ্যাত ফেরাউনের সলিল সমাধি ঘটেছিল। অর্থাৎ একক দিন হিসেবে এত ঘটনাবহুল অবিস্মরণীয় দিবস পৃথিবীর ইতিহাসে আর দ্বিতীয়টি নেই।

মহরম ও আশুরার যাবতীয় শিক্ষা শুধু মুসলমানদের জন্য নয়, আহলে কিতাব তথা ইহুদী-খ্রীস্টানদের জীবনকেও প্রভাবিত করে। তাই দেখা যায়, ইহুদী ধর্মেও এদিনকে উপলক্ষ করে রোজা রাখার প্রথা রয়েছে। বুখারী শরীফের ২০০৪নং হাদিসে আছে যখন নবীজী (সা.) মদিনা হিজরত করেন তখন তিনি দেখলেন এদিন ইহুদীরা রোজা রাখছে। তিনি এর কারণ জানতে চাইলেন। তারা জানালো হাজা ইয়ামুন সালেহ- এ এক মহান দিন, এদিন আল্লাহ নবী মুসা ও বনী ইসরাইলকে শত্রু ফেরাউন থেকে নীল নদের ওপারে নিয়ে নাজাত দিয়েছিলেন। তাই আমরা সে ঘটনা স্মরণ করে রোজা রাখি।

তখন আমাদের নবীজী বলেছেন- আনা আহাক্কু মিনকুম- আমি তো তোমাদের চেয়েও মুসা (আ.) এর অধিক ঘনিষ্ঠ। সুতরাং আমরাও রোজা রাখব। তখন থেকে মুসলমানরা ইহুদী সম্প্রদায়ের একটি রোজা রাখার স্থলে দুটি রোজা রাখতেন। নবীজী (সা.) আরও ইরশাদ করেছেন আল্লাহ যদি আমাকে হায়াতে রাখেন তাহলে আমি মহরমের ৯ তারিখও রোজা রাখব।’ এখান থেকে বুঝতে পারলাম মহরমের ৯ ও ১০ তারিখ রোজা রাখা ছিল মহানবী (সা.)-এর প্রিয় আমল।

উম্মতে মুহাম্মদীর কাছে এদিনটি আরও একটি বিশেষ কারণে অবিস্মরণীয়। ৬১ হিজরীর এদিনে নুরনবী হযরত মুহম্মদ (সা.) এর প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র, হযরত আলী-ফাতিমা (রা.) এর দ্বিতীয় পুত্র ইমাম হুসাইন (রা.) এবং নবী পরিবারের প্রায় সকল পুরুষ ও সদস্য কারবালা প্রান্তরে ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে মর্মান্তিকভাবে শাহাদাতবরণ করেন। এ হৃদয় বিদারক ঘটনা আশুরাকে দান করেছে এক নতুন তাৎপর্য। বস্তুত কারবালার ঘটনাটি ছিল হক ও বাতিলের সংঘাত।

যুগে যুগে নবী-রাসুলগণের মিশন ছিল বাতিল আর মিথ্যার ওপর সত্যের দাওয়াতকে বুলন্দ করা। আখেরি নবী হযরত মুহম্মদ (সা.) এর ওফাতের পর এর দায়িত্ব বর্তায় তার যোগ্য উত্তরসূরিদের ওপর। খোলাফায়ে রাশেদীন এ দায়িত্বের আঞ্জাম দেন। তারা কুরআন ও হাদিসের আলোকে প্রবর্তিত মহানবীর (সা.) শরীয়তকে সবধরনের বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করেন। তাদের তিরোধানের পর এক শ্রেণীর ষড়যন্ত্রকারী ইসলামী শরীয়তকে বিকৃত করতে থাকে। তারা নিষ্কলুষ শরীয়ত ও খিলাফতকে গোত্রীয় বন্দীশালায় আবদ্ধ করে ফেলতে চায়। যার পরিণতিতে উদ্ভূত হয়েছিল কারবালার ঘটনা। ইমাম হুসাইন (রা.) এর একটি ভাষণ থেকে তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

তার ভাষায়- যে ইসলামী পন্থাকে অবনমিত করেছে, হয়েছে প্রমোদ বিহারী, যার দরবারে স্বাধীনতা নেই, যে অবৈধকে বৈধ করেছে এবং দুর্বল-দারিদ্র্যের জীবনযাত্রা দোজখের পর্যায়ে নামিয়ে দিয়েছে আমি তার প্রতি আনুগত্য প্রকাশে প্রস্তুত নই…।’ তাই তিনি জালিমের রক্ত চক্ষুকে আর ভয় না করে নিজের ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনের দিকে মনোনিবেশ করেন। আসলে সেদিন তিনি যদি অন্যায় কাজে সামান্যতমও আপোস করতেন তাহলে ইতিহাস হতো আজ অন্য রকম। কিন্তু ইমাম হুসাইন ৭২ জন সঙ্গীসাথীসহ শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করে মুসলমান ও দুনিয়াবাসীর সামনে দেখিয়ে গেছেন অন্যায়ের প্রতিবাদের প্রকৃত ভাষা ও যুগ সন্ধিক্ষণে বীর পুরুষদের ভূমিকা কি হওয়া উচিত।

ইতিহাস বলছে, ৬৭৯ খ্রিস্টাব্দে আমীরে মুয়াবিয়া তার অযোগ্য পুত্র দুরাচারী ইয়াজিদকে খেলাফতের মতো পবিত্র মসনদের উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন। মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পর ইয়াজিদ খেলাফত গ্রহণ করলে গোটা উম্মাহর মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও উত্তেজনা দেখা দেয়। উপরন্তু ইয়াজিদ সে যুগের সর্বজন শ্রদ্ধেয় ইমাম ও ব্যক্তিত্ব হুসাইন (রা.) কে তার হাতে বায়াত হতে নির্দেশ দেন। আল্লাহর রাসুলের প্রিয় দৌহিত্র অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে ও ঘৃণাভরে তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং ইয়াজিদের অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলেন। এদিকে কুফাবাসী সাহায্যের আশ্বাস দিয়ে তাকে সেখানে আগমনের অনুরোধ করেন।

একপর্যায়ে ইমাম হুসাইন (রা.) যখন কুফার উপকণ্ঠে পৌঁছেন তখন দেখা গেল সাহায্যের আশ্বাসদাতা কুফাবাসীগণ তাদের প্রস্তাব থেকে সরে যায়। অগত্যা নিরুপায় হয়ে ইমাম হুসাইন (রা.) যখন তার স্বল্পসংখ্যক বন্ধু ও সমর্থক নিয়ে ফোরাত নদীর উপকূলে কারবালায় পৌঁছেন তখন ইয়াজিদ বাহিনীর সদস্য ওমর ইবনে সাদ, ওবায়দুল্লাহ প্রমুখ তার গতিরোধ করে এবং তাকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেয়। মহান ইমাম পবিত্র ইসলাম ও নানাজী হযরত মুহাম্মদের আদর্শের পরিপন্থী কোন কর্মকা-ে সাড়া দিতে পারেন না। একপর্যায়ে ইয়াজিদ বাহিনী তাদের ওপর হামলা চালাতে থাকলে তারা মৃত্যুকে পরওয়া না করে ইয়াজিদ বাহিনীর সঙ্গে শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত বিসর্জন দিয়ে যুদ্ধ করে যান। ৬৮০ খ্রিস্টাব্দের ১০ অক্টোবর ইয়াজিদ সেনারা ইমাম হুসাইনের সঙ্গী-সাথী ও পরিবার-পরিজনের শিবিরে ফোরাতের পানি নেয়া বন্ধ করে দেয়। এতে গোটা শিবিরে হাহাকার পড়ে যায়।

এ যুদ্ধে ভ্রাতুষ্পুত্র কাশেম প্রথম শাহাদাতবরণ করেন। পরে একে একে ৭২ জন শহীদ হন। ইমাম হুসাইন (রা.) কে যেরূপ নির্মম বর্বরোচিতভাবে হত্যা করা হয় মানব ইতিহাসে সে রকম ঘটনা খুব বেশি নেই। তেমনি মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে তিনি যেরূপ সাহসিকতা, নির্ভীকতা ত্যাগ ও নিষ্ঠার নজির তুলে ধরেন তাও দুর্লভ। ইমাম হুসাইনের এ মর্মন্তুদ পরিণতি সারা বিশ্বের মুসলমানকে শোকে-দুঃখে আজও মুহ্যমান করে তোলে এবং সত্য ও ন্যায়ের সংগ্রামে মহত্ত্বর প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করে। তাই মহরম ও আশুরার ঘটনাবলী বিশেষ করে মুসলমানদের কাছে ঈমানি তেজোদ্দীপনার এক অনির্বাণ শিখা।

পবিত্র মহরম ও আশুরা একান্ত ধর্মীয় ভাবগম্ভীর পর্ব হলেও এক সময় কিছু অতি হুসাইনী প্রেমিকের হাতে বাড়াবাড়িতে রূপ নিয়েছে। তারা এ নিয়ে তাজিয়া মিছিল করে মার্সিয়ায় উন্মাদনা ছড়ায়, হায় হুসাইন হায় হুসাইন বলে রক্ত ঝরায়, ঢোল, তবলা বাজায়। ইসলাম শান্তির ধর্ম। কারও মৃত্যু বা শোকেও বাড়াবাড়ির সুযোগ নেই। সূরা বাকারায় এমন পরিস্থিতিতে ধৈর্য ও আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণের তাগিদ দেয়া হয়েছে। আর খুনাখুনিকে জাহিলিপনা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। (ইবনে মাজাহ)।

মুসনাদে আহমদ বর্ণিত এক হাদিসে আছে- যে উল্লাস হাত এবং মুখের উচ্চারণে হয় তা শয়তানের কাজ। আর যা অশ্রু ঝরিয়ে হৃদয় মাড়িয়ে স্মরণ করা হয় তা আল্লাহর পক্ষ থেকে। পরিশেষে আল্লাহ যেন আমাদের পবিত্র মহরম ও আশুরার বরকত নসিব করেন এবং হুসাইন উত্তর এ পৃথিবী যেন সঠিক আকিদা বিশ^াসের মুসলিম নেতৃত্ব পায়, একতা ভাতৃত্বের জয়ধ্বনি বুলন্দ হয়, ভাইয়ে ভাইয়ে হিংসা হানাহানি দূর হয়- এই মোনাজাত করি।

লেখক : অধ্যাপক, টিভি উপস্থাপক ও জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত খতিব

নিউজবিজয়২৪/এফএইচএন

👉 নিউজবিজয় ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন ✅

আপনার সোস্যাল মিডিয়ায় শেয়ার দিন।

NewsBijoy24.Com

নিউজবিজয়২৪.কম একটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল। বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যভিত্তিক সংবাদ প্রকাশের প্রতিশ্রুতি নিয়ে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। উৎসর্গ করলাম আমার বাবার নামে, যাঁর স্নেহ-সান্নিধ্যের পরশ পরিবারের সুখ-দু:খ,হাসি-কান্না,ব্যথা-বেদনার মাঝেও আপার শান্তিতে পরিবার তথা সমাজে মাথা উচুঁ করে নিজের অস্তিত্বকে মেলে ধরতে পেরেছি।

ট্রাক-অটোরিকশা সংঘর্ষে একই প‌রিবা‌রের তিনজনসহ নিহত ৪

ঘটনাবহুল মহরম ও আশুরার তাৎপর্য

প্রকাশিত সময় :- ০৬:৫০:৩৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ জুলাই ২০২৩

আজ পবিত্র আশুরা বা মহরম মাসের দশম তারিখ। মুসলিম ধর্ম, সমাজ ও সংস্কৃতিতে মহরম, আশুরা ও কারবালা অতি ব্যাপক অর্থবোধক তিনটি পরিভাষা। ইসলামী মূল্যবোধে এ তিনটির প্রভাবও বেশ সুদূরপ্রসারী। হাদিস শরীফে একক দিন হিসেবে আশুরার যে তাৎপর্য বর্ণিত হয়েছে তার সারসংক্ষেপ হলো- এ পবিত্র দিনে আল্লাহ্ তায়ালা অসংখ্য নবী-রাসুল দুনিয়ার মানুষের কল্যাণে বিভিন্ন সময় আবির্ভূত করেছেন। আশুরার দিনে আল্লাহ্ সুবহানাহু তায়ালা আসমান-যমিন, পাহাড়-পর্বত, তারকারাজি, আরশ-কুরসি, লওহে মাহফুজ ও ফেরেশতাদের সৃষ্টি করেন। এদিন আদম, হাওয়াকে (আ.) সৃষ্টি করা হয়েছে। এ দিনেই তাদেরকে বেহেশতবাস দেয়া হয়।

আবার এ দিনেই তাদেরকে বেহেশত থেকে নির্গত করে দুনিয়ায় প্রেরণ করা হয়। এদিন অন্তত দু’হাজার পয়গাম্বর জন্মগ্রহণ করেন এবং অন্তত ২ হাজার পয়গাম্বর ওফাতপ্রাপ্ত হন। হযরত আদম-হাওয়ার তাওবা কবুল হয়েছিল এদিনে। আর অঝোর ধারায় রহমতের বৃষ্টির সূচনা হয়েছিল এদিনে। পৃথিবী ধ্বংসপ্রাপ্তও হবে এদিনে। মহানবী হযরত মুহম্মদ (সা.) কে এদিনেই চিরতরে নিষ্পাপ ঘোষণা করা হয়েছিল। এদিনেই মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পৃথিবীকে বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে সাজিয়েছেন, আবাসযোগ্য করেছেন। আল্লাহ তাঁর অনেক পেয়ারা বান্দাকে এদিন তাঁর করুণাসিক্ত করেছেন। এদিন নমরুদ কর্তৃক ইবরাহিম নবী (আ.) এর জন্য তৈরি অগ্নিকু-কে আল্লাহতায়ালা শান্তির গুলিস্তায় পরিণত করেছিলেন।

এদিন ইউনুস নবী মাছের উদর থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন, ইয়াকুব নবী ফিরে পেয়েছিলেন তার প্রাণের দুলাল ইউসুফ (আ) কে। আবার এদিন ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে অনেক দাম্ভিক, খোদাদ্রোহীকে শাস্তি দান করেছেন। এ দিন মুসা নবী (আ.) কে তাড়াতে গিয়ে নীল নদে কুখ্যাত ফেরাউনের সলিল সমাধি ঘটেছিল। অর্থাৎ একক দিন হিসেবে এত ঘটনাবহুল অবিস্মরণীয় দিবস পৃথিবীর ইতিহাসে আর দ্বিতীয়টি নেই।

মহরম ও আশুরার যাবতীয় শিক্ষা শুধু মুসলমানদের জন্য নয়, আহলে কিতাব তথা ইহুদী-খ্রীস্টানদের জীবনকেও প্রভাবিত করে। তাই দেখা যায়, ইহুদী ধর্মেও এদিনকে উপলক্ষ করে রোজা রাখার প্রথা রয়েছে। বুখারী শরীফের ২০০৪নং হাদিসে আছে যখন নবীজী (সা.) মদিনা হিজরত করেন তখন তিনি দেখলেন এদিন ইহুদীরা রোজা রাখছে। তিনি এর কারণ জানতে চাইলেন। তারা জানালো হাজা ইয়ামুন সালেহ- এ এক মহান দিন, এদিন আল্লাহ নবী মুসা ও বনী ইসরাইলকে শত্রু ফেরাউন থেকে নীল নদের ওপারে নিয়ে নাজাত দিয়েছিলেন। তাই আমরা সে ঘটনা স্মরণ করে রোজা রাখি।

তখন আমাদের নবীজী বলেছেন- আনা আহাক্কু মিনকুম- আমি তো তোমাদের চেয়েও মুসা (আ.) এর অধিক ঘনিষ্ঠ। সুতরাং আমরাও রোজা রাখব। তখন থেকে মুসলমানরা ইহুদী সম্প্রদায়ের একটি রোজা রাখার স্থলে দুটি রোজা রাখতেন। নবীজী (সা.) আরও ইরশাদ করেছেন আল্লাহ যদি আমাকে হায়াতে রাখেন তাহলে আমি মহরমের ৯ তারিখও রোজা রাখব।’ এখান থেকে বুঝতে পারলাম মহরমের ৯ ও ১০ তারিখ রোজা রাখা ছিল মহানবী (সা.)-এর প্রিয় আমল।

উম্মতে মুহাম্মদীর কাছে এদিনটি আরও একটি বিশেষ কারণে অবিস্মরণীয়। ৬১ হিজরীর এদিনে নুরনবী হযরত মুহম্মদ (সা.) এর প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র, হযরত আলী-ফাতিমা (রা.) এর দ্বিতীয় পুত্র ইমাম হুসাইন (রা.) এবং নবী পরিবারের প্রায় সকল পুরুষ ও সদস্য কারবালা প্রান্তরে ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে মর্মান্তিকভাবে শাহাদাতবরণ করেন। এ হৃদয় বিদারক ঘটনা আশুরাকে দান করেছে এক নতুন তাৎপর্য। বস্তুত কারবালার ঘটনাটি ছিল হক ও বাতিলের সংঘাত।

যুগে যুগে নবী-রাসুলগণের মিশন ছিল বাতিল আর মিথ্যার ওপর সত্যের দাওয়াতকে বুলন্দ করা। আখেরি নবী হযরত মুহম্মদ (সা.) এর ওফাতের পর এর দায়িত্ব বর্তায় তার যোগ্য উত্তরসূরিদের ওপর। খোলাফায়ে রাশেদীন এ দায়িত্বের আঞ্জাম দেন। তারা কুরআন ও হাদিসের আলোকে প্রবর্তিত মহানবীর (সা.) শরীয়তকে সবধরনের বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করেন। তাদের তিরোধানের পর এক শ্রেণীর ষড়যন্ত্রকারী ইসলামী শরীয়তকে বিকৃত করতে থাকে। তারা নিষ্কলুষ শরীয়ত ও খিলাফতকে গোত্রীয় বন্দীশালায় আবদ্ধ করে ফেলতে চায়। যার পরিণতিতে উদ্ভূত হয়েছিল কারবালার ঘটনা। ইমাম হুসাইন (রা.) এর একটি ভাষণ থেকে তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

তার ভাষায়- যে ইসলামী পন্থাকে অবনমিত করেছে, হয়েছে প্রমোদ বিহারী, যার দরবারে স্বাধীনতা নেই, যে অবৈধকে বৈধ করেছে এবং দুর্বল-দারিদ্র্যের জীবনযাত্রা দোজখের পর্যায়ে নামিয়ে দিয়েছে আমি তার প্রতি আনুগত্য প্রকাশে প্রস্তুত নই…।’ তাই তিনি জালিমের রক্ত চক্ষুকে আর ভয় না করে নিজের ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনের দিকে মনোনিবেশ করেন। আসলে সেদিন তিনি যদি অন্যায় কাজে সামান্যতমও আপোস করতেন তাহলে ইতিহাস হতো আজ অন্য রকম। কিন্তু ইমাম হুসাইন ৭২ জন সঙ্গীসাথীসহ শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করে মুসলমান ও দুনিয়াবাসীর সামনে দেখিয়ে গেছেন অন্যায়ের প্রতিবাদের প্রকৃত ভাষা ও যুগ সন্ধিক্ষণে বীর পুরুষদের ভূমিকা কি হওয়া উচিত।

ইতিহাস বলছে, ৬৭৯ খ্রিস্টাব্দে আমীরে মুয়াবিয়া তার অযোগ্য পুত্র দুরাচারী ইয়াজিদকে খেলাফতের মতো পবিত্র মসনদের উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন। মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পর ইয়াজিদ খেলাফত গ্রহণ করলে গোটা উম্মাহর মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও উত্তেজনা দেখা দেয়। উপরন্তু ইয়াজিদ সে যুগের সর্বজন শ্রদ্ধেয় ইমাম ও ব্যক্তিত্ব হুসাইন (রা.) কে তার হাতে বায়াত হতে নির্দেশ দেন। আল্লাহর রাসুলের প্রিয় দৌহিত্র অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে ও ঘৃণাভরে তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং ইয়াজিদের অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলেন। এদিকে কুফাবাসী সাহায্যের আশ্বাস দিয়ে তাকে সেখানে আগমনের অনুরোধ করেন।

একপর্যায়ে ইমাম হুসাইন (রা.) যখন কুফার উপকণ্ঠে পৌঁছেন তখন দেখা গেল সাহায্যের আশ্বাসদাতা কুফাবাসীগণ তাদের প্রস্তাব থেকে সরে যায়। অগত্যা নিরুপায় হয়ে ইমাম হুসাইন (রা.) যখন তার স্বল্পসংখ্যক বন্ধু ও সমর্থক নিয়ে ফোরাত নদীর উপকূলে কারবালায় পৌঁছেন তখন ইয়াজিদ বাহিনীর সদস্য ওমর ইবনে সাদ, ওবায়দুল্লাহ প্রমুখ তার গতিরোধ করে এবং তাকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেয়। মহান ইমাম পবিত্র ইসলাম ও নানাজী হযরত মুহাম্মদের আদর্শের পরিপন্থী কোন কর্মকা-ে সাড়া দিতে পারেন না। একপর্যায়ে ইয়াজিদ বাহিনী তাদের ওপর হামলা চালাতে থাকলে তারা মৃত্যুকে পরওয়া না করে ইয়াজিদ বাহিনীর সঙ্গে শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত বিসর্জন দিয়ে যুদ্ধ করে যান। ৬৮০ খ্রিস্টাব্দের ১০ অক্টোবর ইয়াজিদ সেনারা ইমাম হুসাইনের সঙ্গী-সাথী ও পরিবার-পরিজনের শিবিরে ফোরাতের পানি নেয়া বন্ধ করে দেয়। এতে গোটা শিবিরে হাহাকার পড়ে যায়।

এ যুদ্ধে ভ্রাতুষ্পুত্র কাশেম প্রথম শাহাদাতবরণ করেন। পরে একে একে ৭২ জন শহীদ হন। ইমাম হুসাইন (রা.) কে যেরূপ নির্মম বর্বরোচিতভাবে হত্যা করা হয় মানব ইতিহাসে সে রকম ঘটনা খুব বেশি নেই। তেমনি মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে তিনি যেরূপ সাহসিকতা, নির্ভীকতা ত্যাগ ও নিষ্ঠার নজির তুলে ধরেন তাও দুর্লভ। ইমাম হুসাইনের এ মর্মন্তুদ পরিণতি সারা বিশ্বের মুসলমানকে শোকে-দুঃখে আজও মুহ্যমান করে তোলে এবং সত্য ও ন্যায়ের সংগ্রামে মহত্ত্বর প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করে। তাই মহরম ও আশুরার ঘটনাবলী বিশেষ করে মুসলমানদের কাছে ঈমানি তেজোদ্দীপনার এক অনির্বাণ শিখা।

পবিত্র মহরম ও আশুরা একান্ত ধর্মীয় ভাবগম্ভীর পর্ব হলেও এক সময় কিছু অতি হুসাইনী প্রেমিকের হাতে বাড়াবাড়িতে রূপ নিয়েছে। তারা এ নিয়ে তাজিয়া মিছিল করে মার্সিয়ায় উন্মাদনা ছড়ায়, হায় হুসাইন হায় হুসাইন বলে রক্ত ঝরায়, ঢোল, তবলা বাজায়। ইসলাম শান্তির ধর্ম। কারও মৃত্যু বা শোকেও বাড়াবাড়ির সুযোগ নেই। সূরা বাকারায় এমন পরিস্থিতিতে ধৈর্য ও আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণের তাগিদ দেয়া হয়েছে। আর খুনাখুনিকে জাহিলিপনা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। (ইবনে মাজাহ)।

মুসনাদে আহমদ বর্ণিত এক হাদিসে আছে- যে উল্লাস হাত এবং মুখের উচ্চারণে হয় তা শয়তানের কাজ। আর যা অশ্রু ঝরিয়ে হৃদয় মাড়িয়ে স্মরণ করা হয় তা আল্লাহর পক্ষ থেকে। পরিশেষে আল্লাহ যেন আমাদের পবিত্র মহরম ও আশুরার বরকত নসিব করেন এবং হুসাইন উত্তর এ পৃথিবী যেন সঠিক আকিদা বিশ^াসের মুসলিম নেতৃত্ব পায়, একতা ভাতৃত্বের জয়ধ্বনি বুলন্দ হয়, ভাইয়ে ভাইয়ে হিংসা হানাহানি দূর হয়- এই মোনাজাত করি।

লেখক : অধ্যাপক, টিভি উপস্থাপক ও জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত খতিব

নিউজবিজয়২৪/এফএইচএন